ভূমিকা

এমন কোনও মানুষ নেই, যে কোনদিনও মিথ্যা কথা বলেনি। আমরা সকলেই সময়ে অসময়ে প্রয়োজনে মিথ্যা কথা বলে থাকি। আমরা নিজেরা অন্যদের মিথ্যা কথা বললেও, কেউ আমাদের মিথ্যা কথা বলবে, তা মটেই মেনে নিতে পারি না। কিন্তু মানুষ মিথ্যা বলে কেন? এর পিছনে রয়েছে বিভিন্ন মনস্তাত্ত্বিক ও সামাজিক কারণ। মানুষ যে আদি থেকেই মিথ্যা কথা বলতো, তা কিন্তু নয়। সমাজ যত উন্নত হয়েছে, তথ্যপ্রযুক্তিতে যতই প্রসার করেছে, মানুষের মধ্যেও চারিত্রিক গুণাগুণের পরিবর্তন এসেছে। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এই পরিবর্তনগুলো মন্দ চাইতে ভালো নয়।

 

আমাদের সমাজে একদল মানুষ আছে, যারা বলে থাকেন, “প্রয়োজনে মিথ্যা কথা বলা কোন অপরাধ নয়!”। আবার অনেকে বলেন, “প্রয়োজনে হোক বা না হোক, কখনই মিথ্যা বলা উচিত নয়”। এদের পক্ষে ও বিপক্ষে বহু যুক্তি আছে। মানুষ যে মিথ্যা কথা বলে তা আমরা জানি। কিন্তু আপনি একজন মিথ্যাবাদীকে চিনবেন কীভাবে? এর কোন উপায় আছে? একজন শিক্ষিত, জ্ঞানী বা জীবনের অভিজ্ঞতায় চতুর মানুষ পর্যন্ত, জীবনে অনেকবার ঠকে যায়। মানুষ নিজেকে আসলে যতটা বুদ্ধিমান বা চালাক মনে করে, ততটা কিন্তু সে নয়। গবেষণা বলছে, একজন মিথ্যাবাদী মানুষকে সনাক্ত করার ক্ষেত্রে আমরা অনেক দুর্বল, এই কাজে আমাদের সাফ্যলের হার ৫৪ শতাংশের মতো, যা অনেকটা ভাগ্যগণনা করার মতো।

 

এর মূল কারণ হলো, আমরা একজন মিথ্যাবাদী মানুষকে চেনার জন্য যে সংকেতগুলোর ওপর নির্ভর করি, সে সব বেশিরভাগই ভুল। কয়েক দশক ধরে সমাজের কাছে মিথ্যাবাদী মানুষের একটি অতিসরলীকৃত ও গৎবাঁধা ছবি তুলে ধরা হয়েছেঃ এমন একজন সন্দেহভাজন ব্যক্তি, যার চোখেমুখে অস্থিরতা থাকে, যে ঘামতে থাকে, খুব বেশি ছটফট করে এবং সামান্য চাপেই ভেঙে পড়ে। 


সময়ের সাথে সাথে মিথ্যাবাদীরা নিজেদের আচার আচরণ পালটে নিয়েছে। ফলে, যে সমস্ত চিহ্ন দেখে একজন মিথ্যাবাদীকে আগে চেনা যেত, তা এখন আর করা যায়না। সাধারণত স্নায়বিক অস্থিরতার লক্ষণ দেখলে, তাকে মিথ্যাবাদী বলে ধরে নেওয়া হত। কিন্তু একজন দক্ষ মিথ্যাবাদী শান্ত থাকে। নিজের স্নায়ুর উপর সে নিয়ন্ত্রণ রাখে। আবার অন্যদিকে, একজন সৎ ব্যাক্তির মধ্যে উদ্বেগ ও অস্থিরতা লক্ষ্য করা যায়। তাই মানুষ চিনতে ভুল হতে পারে।

 

আধুনিক মনোবিজ্ঞান ও অপরাধ মনস্তত্ত্বের দৃষ্টিতে মিথ্যাবাদী মানুষ

একজন মিথ্যাবাদী মানুষকে সঠিকভাবে সনাক্ত করার ক্ষেত্রে আধুনিক যুগের অপরাধ মনোবিজ্ঞানীরা এবং আচরণ বিশেষজ্ঞেরা, সনাক্তকরণের মূল চিহ্ন হিসেবে, “আবেগজনিত উদ্বেগ” থেকে সরে গিয়ে Cognitive Load বা “মানসিক চাপের” দিকে দৃষ্টিপাত করেছেন। মিথ্যা কথা বলার জন্য প্রচুর মানসিক ক্রিয়ার প্রয়োজন হয়। 


একজন মিথ্যাবাদীকে প্রথমেই একটা কাল্পনিক গল্প রচনা করতে হয়, এবং তাকে এটা নিশ্চিত করতে হয় যেন তা বাস্তব তথ্যের সাথে পরস্পর বিরোধী না হয়, সাথে শ্রোতাদের প্রতিক্রিয়ার ওপর নজর রাখতে হয় এবং তার নিজের স্বাভাবিক স্নায়বিক প্রতিক্রিয়াগুলোকে দমন করতে হয়। কেবল স্নায়বিক অস্থিরতা না খুঁজে, শুধুমাত্র এই মানসিক চাপের কারণে মানুষের আচরণের মধ্যে যে সূক্ষ্ম বিচ্যুতি দেখা দেয়, সে দিকে নজর দিলে আমরা একজন মিথ্যাবাদীকে শনাক্ত করার সক্ষমতাকে উল্লেখযোগ্যভাবে উন্নত করতে পারি।

 

 

একজন মিথ্যাবাদীকে শনাক্ত করবে এমন সাতটি বৈজ্ঞানিকভাবে সমর্থিত চিহ্ন

 

১. কথাবার্তায় কাঠামোগত অসামঞ্জস্যতা (Structural Inconsistencies)

একজন সৎ মানুষ যখন সত্যি কথা বলে, তার সত্য ঘটনার কথা মনে থাকলেও, তার বিবরণ প্রাকৃতিকভাবে কিছুটা অগোছালো হয়ে থাকে, কিন্তু মূল তথ্যের দিক থেকে তা সবসময় সামঞ্জস্যপূর্ণ হয়। একজন সৎ ব্যক্তি যখন কোনো ঘটনার বর্ণনা করেন, তখন তিনি হয়তো ঘটনার কালানুক্রমিক ধারা মেনে চলেন না, কিন্তু মূল ঘটনাগুলো ও তার তথ্য অপরিবর্তিত থাকে। অন্যদিকে, মিথ্যাবাদীরা একটি আগে থেকে সাজানো বা মুখস্থ করা গল্পের ওপর নির্ভর করে কথা বলে।


অপরাধ মনোবিজ্ঞানীরা এই দুর্বলতাকে কাজে লাগান; তারা ওই ব্যক্তিকে পুরো ঘটনাটি উল্টো দিক থেকে (শেষ থেকে শুরু করে পেছনের দিকে) বর্ণনা করতে বলেন। একটা বানানো গল্প সাধারণত একটি সরল রৈখিক ক্রমে (যেমনঃ A থেকে B, B থেকে C) মুখস্থ করা হয়, তাই একজন মিথ্যাবাদীকে যখন C থেকে শুরু করে পেছনের দিকে, মানে A তে যেতে বলা হয়, তখন তার ওপর মানসিক চাপের পরিমাণ বহুগুণ বেড়ে যায়। এর ফলে সে নিজেদের অজান্তেই অনেক তথ্য বাদ দিয়ে ফেলে, ঘটনার সময়কাল বদলে ফেলে কিংবা নিজের বানানো গল্পের যৌক্তিক ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে ব্যর্থ হয়।

 

২. তথ্যের অভাব (Insufficient Details)

মানুষ যখন ব্যাক্তিগত জীবনের কোনও অভিজ্ঞতা থেকে সত্য ঘটনা বর্ণনা করে, তখন তার কথার মধ্যে স্বাভাবিকভাবেই বিভিন্ন ইন্দ্রিয়লব্ধ অনুভূতি এবং আনুষঙ্গিক খুঁটিনাটি বিষয় উঠে আসে। যেমন—পারিপার্শ্বিক শব্দ, ঘরের তাপমাত্রা কিংবা আশেপাশে ঘটে যাওয়া ছোটখাটো ঘটনা। এগুলো হলো প্রকৃত স্মৃতির (Episodic Memory) অন্যতম বৈশিষ্ট্য।

 

মিথ্যাবাদীরা খুব সচেতনভাবেই তাদের বানানো গল্পকে সংক্ষিপ্ত ও জায়গায় জায়গায় অসম্পূর্ণ রাখে। কারণ, তারা যত বেশি তথ্য দেবে, ততই তাদের মিথ্যা ধরা পড়ে যাওয়ার সম্ভবনা বাড়বে—এমন কোনো তথ্য বেরিয়ে আসতে পারে, যা যাচাই করলে প্রমাণ হবে যে তারা মিথ্যা কথা বলছে। কাল্পনিক কাহিনীগুলো আসলে খুব সরল রৈখিক হয় এবং তাতে কোনো প্রাকৃতিক ইন্দ্রিয়লব্ধ গভীরতা থাকে না। যখন একজন মিথ্যাবাদীর কাছ থেকে কোনও সুনির্দিষ্ট বিষয়ে তথ্য জানতে চাওয়া হয়, তখন তারা প্রায়শই অস্পষ্ট বা সাধারণ কোনো মন্তব্য করে তা এড়িয়ে যায়, বা হয়ত বলে, ‘আমার ঠিক মনে পড়ছে না’ বা ‘অস্পষ্ট লাগছে’। সে ওই মুহূর্তে নতুন কোনো খুঁটিনাটি তথ্য বানিয়ে বলার ঝুঁকি নিতে চায় না।

 

 

৩. ভাষাগত দূরত্ব (Linguistic Distancing)

আমরা জানি ভাষা (Language) একজন মানুষের মনস্তাত্ত্বিক অবস্থার এক অবচেতন প্রতিফলন। তাই কেউ যখন মিথ্যা কথা বলে, তখন সে নিজের ভেতরে এক ধরনের সূক্ষ্ম অপরাধবোধ বা অস্বস্তি অনুভব করে। এই অস্বস্তি বোধ কাটিয়ে ওঠার জন্য, সে অবচেতনভাবেই শব্দ নির্বাচনের মাধ্যমে নিজেকে সেই মিথ্যার ঘটনা থেকে কিছুটা দূরে সরিয়ে রাখার চেষ্টা করে। এই ভাষাগত দূরত্ব বিভিন্নভাবে প্রকাশ পেতে পারে, যেমনঃ

 

কথা বলার সময় উত্তম পুরুষের সর্বনাম (যেমন—‘আমি’) বর্জন করাঃ একজন মিথ্যাবাদী কখন এ কথা বলবে না, “আমি দরাজটা খুলে রেখেছিলাম”, তার পরিবর্তে সে বলবে, “দরজাটা খোলা রাখা হয়েছিল,”।

 

কথা বলার সময় একজন ব্যক্তিকে বস্তু বা অমানবিক সত্তা হিসেবে উপস্থাপন করাঃ একজন মিথ্যাবাদী অনেক সময় কোনো ব্যক্তির নাম ব্যবহার না করে বরং এমন শব্দ ব্যবহার করতে পারে, যেমন— “ওই লোকটা” বা “ওই মহিলাটি”।

 

কথা বলার সময় কর্মবাচ্য (Passive voice) ব্যবহার করাঃ কর্মবাচ্যের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা বক্তার কথা থেকে তার সরাসরি দায়বদ্ধতাকে মুছে ফেলে। যেমন— “আমি কাজে ব্যাস্ত ছিলাম, দরজাটা যে খোলা ছিল, তা দেখতে পাইনি”।

 

 

৪. অণু-অভিব্যক্তি (Micro-expressions) এবং আবেগীয় অসামঞ্জস্য

ড. পল একম্যানের প্রবর্তিত ‘অণু-অভিব্যক্তি’ বিষয়ক গবেষণায় দেখা গেছে, মানুষের সচেতন মস্তিষ্ক কোনো আবেগকে গোপন করার আগেই, মানুষের মুখমণ্ডলে ক্ষণিকের জন্য (এক সেকেন্ডের ভগ্নাংশ সময়ের জন্য) প্রকৃত আবেগ ফুটে ওঠে। যেমন অবজ্ঞা, ভয় বা আনন্দের একটি ঝলক—এমনকি কাউকে বোকা বানাতে পেরে মিথ্যাবাদীদের মনে যে এক ধরনের রোমাঞ্চ তৈরি হয়, মনবিজ্ঞানের ভাষায় একে বলা হয় ‘ডুপিং ডিলাইট’ (Duping Delight)—এটা এক সেকেন্ডের পাঁচ ভাগের এক ভাগ সময়ের চেয়েও কম সময়ের জন্য তার মুখে ভেসে উঠতে পারে।

 

তাছাড়া, কৃত্রিম আবেগের ক্ষেত্রে প্রায়শই সামঞ্জস্যের অভাব দেখা যায়। একটি আন্তরিক হাসির ক্ষেত্রে—যাকে ‘ডুশেন স্মাইল’ (Duchenne Smile) বলা হয়—তখন মুখের চারপাশের পেশির পাশাপাশি চোখের চারপাশের পেশিও সক্রিয় হয় (যার ফলে চোখের কোণে ভাঁজ বা ‘Crow's Feet’ তৈরি হয়)। অন্যদিকে, মিথ্যা বা প্রতারণা ঢাকার জন্য মানুষ যে কৃত্রিম হাসি হাসে, সে হাসিতে সাধারণত কেবল মুখের নিচের অংশটিই সক্রিয় থাকে। যদি কারো মুখের অভিব্যক্তি কিছুটা অসম বলে মনে হয় বা তা চোখের ওপর পর্যন্ত না পৌঁছায়, তবে বুঝতে হবে সেটি জোর করে দেখানো হচ্ছে। এটা মিথ্যা আবেগের একটি জোরালো লক্ষণ।

 

৫. কণ্ঠস্বরের পরিবর্তন (Vocal Fluctuations) এবং অস্বাভাবিক বিরতি

অপরাধ মনবিজ্ঞানের বিশেষজ্ঞরা মিথ্যা কথা বলার লক্ষণ হিসেবে অস্থিরতা বা ছটফট করাকে (Fidgeting) একটি ভ্রান্ত ধারণা হিসেবে মনে করেন। তবে কণ্ঠস্বরের পরিবর্তন একটি সুনিশ্চিত ও প্রমাণিত বিষয়। মিথ্যা কথা বলার সময় শরীরে এক ধরনের মানসিক চাপের প্রতিক্রিয়া (Physiological Stress Response) তৈরি হয়, যা মানুষের কণ্ঠনালির পেশিকে সংকুচিত করে ফেলে; এর ফলে কণ্ঠস্বরের উচ্চতা বা পিচ (Pitch) লক্ষণীয়ভাবে বেড়ে যায়।

 

কণ্ঠস্বরের উচ্চতা বাড়ার সাথে, মস্তিষ্ক যখন একটি মিথ্যাকে বজায় রাখার জন্য একই সঙ্গে অনেকগুলো কাজ (Multitasking) করে, তখন কথা বলার স্বাভাবিক ধরন ব্যাহত হয়। আপনি হয়তো লক্ষ্য করবেন যে, কথা বলার সময় অহেতুক শব্দ (যেমন— ‘উম’, ‘আহ’, ‘আহাম’) ব্যবহারের প্রবণতা বেড়ে যায় অথবা একজন ব্যক্তি তোতলামি করতে শুরু করেন। 


সবচেয়ে লক্ষণীয় বিষয় হলো, মিথ্যাবাদীরা কোনো প্রশ্নের সঠিক উত্তর দিতে গিয়ে অনেকটা সময় নিয়ে থাকে। সরাসরি কোনো প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার আগে তারা যে দীর্ঘ বিরতি নেয়; এই কয়েক মিলিসেকেন্ড সময় তারা ব্যয় করে এটি যাচাই করতে যে, তাদের সাজানো মিথ্যা উত্তরটি তাদের পূর্বনির্ধারিত বানানো গল্পের সাথে মিলছে কি না। বিপরীত দিকে আবার, কিছু মিথ্যাবাদী যারা আগে থেকেই মিথ্যা কথা বলার প্রস্তুতি নিয়ে রাখে, তারা আবার খুব তাড়াতাড়ি উত্তর দিয়ে ফেলে— যা একজন সৎ ব্যক্তির ক্ষেত্রে স্মৃতি থেকে তথ্য খুঁজে বের করতে যে স্বাভাবিক সময় (Cognitive Delay) প্রয়োজন হয়, তার অভাব নির্দেশ করে।

 

 

৬. অতিরিক্তসাফাই দেওয়া (Information Dumping)

যারা সত্য কথা বলেন, তারা সাধারণত জানেন যে, তাদের বলা কথা ও তাদের বর্ণনাগুলো বিশ্বাসযোগ্য। তারা শুধুমাত্র জিজ্ঞাসিত প্রশ্নের উত্তর দেন এবং তারপর চুপ করে যান। অন্যদিকে, মিথ্যাবাদীরা, তাদের মনে সবসময় এই ভয় কাজ করে যে কেউ তাদের কথা বিশ্বাস করবে না, তাই তারা প্রয়োজনের অতিরিক্ত কথা বলে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করে।

 

এর ফলে ঘটে “তথ্য উপচে পড়ার” মতো ঘটনা। মিথ্যাবাদীরা একটি সাধারণ প্রশ্নের উত্তরেও নিজে থেকেই নানা সাফাই গাইতে শুরু করেন, দীর্ঘ পটভূমি বর্ণনা করেন এবং অপ্রাসঙ্গিক প্রসঙ্গ টেনে আনেন। যেমন, “গত রাতে আপনি কি খেয়েছিলেন?” —এই প্রশ্নের উত্তরে একজন সত্যবাদী হয়তো বলবেন, “আমি রুটি খেয়েছিলাম।” কিন্তু একজন মিথ্যাবাদীর এ ক্ষেত্রে এমন কথা বলার সম্ভাবনা বেশিঃ “আমি বাইরে খেতে গিয়েছিলাম কারণ আমার ফ্রিজটা একদম খালি ছিল, আর আমি কাজ করছিলাম... রাত হয়ে যাচ্ছিল, তাই আমি আসলে বাইরের দোকান থেকে কিছু একটা খাবার কিনতে বেড়িয়ে ছিলাম”। এই অতিরিক্ত বিশদ বর্ণনা হলো একটি দুর্বল চরিত্রকে ঘিরে বিশ্বাসযোগ্যতার এক প্রাচীর তৈরির প্রচেষ্টা।

 

৭. “স্তব্ধ” ভঙ্গি এবং অমৌখিক অমিল (Nonverbal Mismatches)

“মিথ্যাবাদীরা ছটফট করে আর পায়চারি করে বেড়ায়!”— এই পুরোনো ধারণাটি মনোবিজ্ঞানীরা বাতিল করেছেন। আধুনিক গবেষণা দেখায় যে, যারা বড় ধরনের প্রতারণায় জড়িত, তারা প্রায়শই এর ঠিক বিপরীতটা করেঃ তারা স্তব্ধ হয়ে যায়।

 

মিথ্যাবাদীরা একথা জানে যে তাদের শারীরিক ভাষা (Body Language) লক্ষ্য করা হতে পারে, তাই তারা সচেতনভাবে এটিকে নিয়ন্ত্রণ করার আপ্রাণ চেষ্টা করে। এই অতিরিক্ত নিয়ন্ত্রণের কারনে তাদের শারীরিক ভঙ্গি স্বাভাবিকের তুলনায় শক্ত ও অনমনীয় হয়ে যায় এবং স্বাভাবিক কথোপকথনের তুলনায় হাতের অঙ্গভঙ্গি লক্ষণীয়ভাবে কম থাকে।

 

এছাড়াও আমাদের, অমৌখিক অমিলের দিকে নজর রাখতে হবে। মানুষের মস্তিষ্ক কথিত মিথ্যাকে স্বাভাবিক ও প্রকৃতিগত শারীরিক প্রতিক্রিয়ার সাথে সমন্বয় করতে হিমশিম খায়। এর একটি জনপ্রিয় উদাহরণ হলো, কোনো ব্যক্তি মুখে হয়তো “না” বলছে, কিন্তু সূক্ষ্মভাবে মাথা নেড়ে “হ্যাঁ” বোঝাচ্ছে। অথবা কোনো চূড়ান্ত সিধান্ত দেওয়ার সময় অনিশ্চয়তার ভঙ্গিতে সে কাঁধ ঝাঁকাচ্ছে।

 

শেষের কথা

বাস্তব জগতে একজন মিথ্যাবাদী বা প্রতারককে শনাক্ত করা মানে শুধুমাত্র বাঁধাধরা কতগুলো “ইঙ্গিত” নয়। পেশাদার তদন্তকারীরা শুধুমাত্র গলা খাকারি দেওয়া বা থেমে যাওয়া উত্তরের উপর নির্ভর করে কাউকে মিথ্যাবাদী হিসেবে চিহ্নিত করেন না। কোনো ব্যক্তির স্বাভাবিক প্রকৃতিগত আচরণ প্রতিষ্ঠা করা জন্য, অর্থাৎ, তারা যখন সম্পূর্ণ স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন, তখন তারা কীভাবে আচরণ করছেন, কীভাবে কথা বলছেন এবং শারীরিক অঙ্গভঙ্গি করছেন তার দিকে লক্ষ্য রাখেন। সেখান থেকেই, একজন মিথ্যাবাদীকে শনাক্ত করা এক গুচ্ছ বিশ্লেষণের বিষয় হয়ে দাঁড়ায়ঃ যেমন জ্ঞানীয় চাপ, ভাষাগত দূরত্ব এবং সেই প্রতিষ্ঠিত ভিত্তি থেকে বিচ্যুত অমৌখিক অমিলের একটি অভিসার খোঁজা।

 

দৈনন্দিন জীবনে একজন মিথ্যাবাদী বা প্রতারককে চেনা সহজ কাজ নয়। মানুষ স্বাভাবিক ভাবেই খুব জটিল এক প্রাণী। আমারা অনেক সময় সেই মানুষটিকে চিনতে ভুল করি, যাদেরকে আমরা জানি বলে দাবী করে থাকি, যাদের সাথে আমরা এক ঘরে বহুকাল বসবাস করেছি, বা অনেক বছর তাদের সাথে মেলামেশা করেছি। মানুষ মিথ্যা কথা বলে, মূলত নিজের আসল পরচয় ও কাজকর্ম গোপন রাখার জন্য। তবে বর্তমান সমাজ এর জন্য অনেকটাই দায়ী বলে ধরে নেওয়া হয়। 


যে সমাজে একজন সৎ মানুষকে সত্য কথা বলার কারণে পুরষ্কারের পরিবর্তে শাস্তি পেতে হয়, সে সমাজে মানুষ সত্য কথা বলার চাইতে মিথ্যা কথাই বলবে। মানুষ স্বাভাবিক ভাবেই তেমন সব বিষয় এড়িয়ে চলে, যেখানে তাকে শাস্তি পেতে হয়। কিন্তু তার অর্থ এই নয়, যে মিথ্যা কথা বলতেই হবে। এ বিষয়ে আমাদের অনেক কাজ করতে হবে এবং সমাজে নৈতিক আচরণের যথাযোগ্য পুরস্কার হিসেবে মানুষকে সৎ কাজ ও সত্যি কথা বলার জন্য পুরস্কৃত করতে হবে।  

 

তথ্যসূত্রঃ

১. DePaulo, B. M., Lindsay, J. J., Malone, B. E., Muhlenbruck, L., Charlton, K., & Cooper, H. (2003). Cues to deception. Psychological Bulletin, 129(1), 74–118. https://doi.org/10.1037/0033-2909.129.1.74

২. Ekman, P. (2001). Telling lies: Clues to deceit in the marketplace, politics, and marriage. W. W. Norton & Company.

৩. Vrij, A. (2008). Detecting lies and deceit: Pitfalls and opportunities (2nd ed.). John Wiley & Sons.

৪. Vrij, A., Fisher, R. P., Mann, S., & Leal, S. (2006). A cognitive load approach to lie detection. Journal of Investigative Psychology and Offender Profiling, 3(2), 89–105. https://doi.org/10.1002/jip.52