যুক্তির সূচনা - The Argument from Conscience

 

ঈশ্বরের অস্তিত্বের সপক্ষে পবিত্র বাইবেলে যে দুটি যুক্তির ইঙ্গিত পাওয়া যায়, তার মধ্যে একটি হলো “বিবেকের ওপর ভিত্তি করে দেওয়া যুক্তি” (অন্যটি হলো মহাবিশ্বের নকশা বা পরিকল্পনার ওপর ভিত্তি করে দেওয়া যুক্তি; সাধু পলের রোমীয়দের কাছে লিখিত পত্রে এর উল্লেখ পাওয়া যায়)। তবে এই যুক্তিগুলো মূলত মানব মনের সহজ ও স্বাভাবিক সহজাত বোধের ওপর প্রতিষ্ঠিত। শুধুমাত্র তখনই এই যুক্তিগুলো জটিল বলে মনে হতে পারে, যখন কেউ এদের বিরুদ্ধে কৃত্রিম ও জটিল আপত্তি তোলে।

 

বিবেকের ওপর ভিত্তি করে দেওয়া এই যুক্তির মূল কথা হলো — পৃথিবীর প্রতিটি মানুষই অন্তরের গভীরে একথা জানে যে, ভালো হওয়া এবং ভালো কাজ করার জন্য এক পরম বাধ্যবাধকতার প্রয়োজন; আর এই পরম বাধ্যবাধকতা কেবল ঈশ্বরের কাছ থেকেই আসতে পারে। সুতরাং, এই নৈতিক বোধ — যাকে আমরা আসলে ‘বিবেক’ বলে থাকি — এরই মাধ্যমে সমস্ত মানুষ ঈশ্বরকে একপ্রকার জানে, যদিও সেই জানাটা স্পষ্ট নয়। তাই আমরা বলে থাকি, “বিবেক” হলো মানুষের অন্তরে ও তার আত্মায় ঈশ্বরের কণ্ঠস্বর।

 

ঈশ্বরের অস্তিত্বের সপক্ষে অন্যান্য সকল যুক্তির মতোই, এই যুক্তিটিও ঈশ্বর সম্পর্কে আমাদের যে অর্জিত জ্ঞান আছে, তার একটি ক্ষুদ্র অংশই প্রমাণ করে — যে জ্ঞান আমরা মূলত ঐশ্বরিক প্রত্যাদেশের মাধ্যমে পেয়ে থাকি। এখানে বলে রাখা দরকার, প্রকৃতি থেকে প্রাপ্ত যুক্তিগুলোর তুলনায় এই যুক্তিটি ঈশ্বরের অস্তিত্ব সম্পর্কে অনেক বেশি কিছু প্রকাশ করে, কারণ এর ভিত্তি অনেক বেশি সমৃদ্ধ। 


এই যুক্তিতে আমরা এক ধরনের ‘অভ্যন্তরীণ তথ্য’ পাইঃ আমাদের অন্তরের গভীরে স্বয়ং ঈশ্বরের কণ্ঠস্বর কথা বলে চলে — যদিও সেই কণ্ঠস্বর অস্পষ্ট, ফিসফিসানির মতো, এবং তা আমরা অনেক সময় ঠিকমতো শুনতে পাই না, স্বীকার করি না বা তাতে কর্ণপাতও করি না। প্রকৃতি থেকে যে সকল যুক্তিগুলো পাওয়া যায়, তেমন তথ্যের ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠা ব্যাখ্যা অনেকটা কোনো লেখকের লেখা বইয়ের মতো; অন্যদিকে, বিবেকের ওপর ভিত্তি করে দেওয়া যুক্তি এমন তথ্য ও জ্ঞানের ওপর দাঁড়িয়ে থাকে, যা সরাসরি লেখকের অন্তরের কথোপকথনের মতো।

 

যুক্তির ব্যাখ্যা


সবার আগে, আমাদের এই ‘বিবেক’ (Conscience) নামক মূল পরিভাষাটিকে সংজ্ঞায়িত ও স্পষ্ট করে নিতে হবে। আধুনিক সময়ের অর্থে এটি এমন এক অনুভূতিকে বোঝায় যেঃ “আমি হয়তো ভুল কিছু করেছি অথবা ভুল করতে যাচ্ছি”। ক্যাথলিক ধর্মতত্ত্বে এর অর্থ হলো — সঠিক ও ভুলের জ্ঞান; অর্থাৎ নৈতিকতার ক্ষেত্রে বুদ্ধির প্রয়োগ। এই যুক্তিতে ‘বিবেক’ কেবল কোনো অনুভূতি নয়, বরং এক ধরনের জ্ঞানকে বোঝানো হয়েছে। মনে রাখা দরকার, এটি যুক্তিভিত্তিক বা বিশ্লেষণমূলক জ্ঞান নয়, বরং এক ধরনের স্বজ্ঞাত জ্ঞান। 


এটি মূলত এমন এক জ্ঞান যা মানুষকে জানায় যে, তাকে সবসময় ভাল কাজই করা উচিত এবং কখনোই খারাপ কাজ করা উচিত নয়। এ হলো মঙ্গলের প্রতি — অর্থাৎ ন্যায়বিচার, পরোপকার, সদ্গুণ ও পবিত্রতার মতো সকল প্রকার মঙ্গলের প্রতি — মানুষের পরম দায়বদ্ধতার জ্ঞান। আর কোন কাজ সঠিক এবং কোনটা ভুল — এই জ্ঞানটি আসে দ্বিতীয় পর্যায়ে। দ্বিতীয় পর্যায়ের এই জ্ঞানকে বলা হয় হলো নৈতিক তথ্যের জ্ঞান; অন্যদিকে, প্রথম পর্যায়ের জ্ঞানটি হলো মানুষের ব্যক্তিগত নৈতিক দায়বদ্ধতার জ্ঞান — অর্থাৎ নৈতিক নিয়ম এবং আমার জীবনের ওপর তার বাধ্যতামূলক কর্তৃত্বের জ্ঞান। এই জ্ঞানই হলো ‘বিবেক থেকে প্রাপ্ত যুক্তি’ (Argument From Conscience)-এর ভিত্তি।

 

এই যুক্তিকে অনেকের আপত্তি থাকতে পারে


এমন কেউ দাবি করতে পারেন যে, তার মধ্যে এমন কোনো জ্ঞান (বিবেক থেকে প্রাপ্ত জ্ঞান) নেই, অথবা তিনি তেমন কিছু দেখতে পাচ্ছেন না, তখন তার ক্ষেত্রে এই যুক্তি কার্যকর হবে না। প্রশ্ন থেকে যায় — তিনি কি সত্যিই তা দেখতে পাচ্ছেন না (অর্থাৎ তার মধ্যে কি বিবেকই নেই, নাকি তার বিবেক মারাত্মকভাবে ত্রুটিপূর্ণ)? নাকি আসলে তার সেই যে জ্ঞান আছে, তা তিনি নিজের ইচ্ছায় অবদমিত করে রেখেছেন? ঐশ্বরিক প্রত্যাদেশ আমাদের জানায় যে, তিনি আসলে সেই জ্ঞানকে অবদমিত করে রেখেছেন (রোমীয় ১:১৮; ২:১৫)। 


আমরা এ কথা জানি, মানুষের বিবেক ত্রুটিপূর্ণ হতে পারে। তেমন অনেক উদাহরণ আমরা মানবসমাজে দেখতে পাই। অনেক সময় জ্ঞানি ও শিক্ষিত মানুষজনও এমন সব কথা বলেন বা কাজকর্ম করেন, যা দেখে আমরা নিন্দা করি, অথবা তাকে প্রকৃত মানুষ বলেই মনে করি না। এমন অবস্থায় মানুষের পক্ষে যৌক্তিক বা দার্শনিক আলোচনার আগে প্রয়োজন নিজের অন্তরের গভীরে সততার সাথে অনুসন্ধান চালানো দরকার, যাতে সেই ‘তথ্য’ বা ‘উপাদানটি’ (বিবেক) ​​খুঁজে পাওয়া যেতে পারে। এই বিবেক যেন মানুষের বাড়ির আঙিনায় পুঁতে রাখা এক গুপ্তধনের মতো। কেউ যদি আমাকে বলে সেখানে কিছু আছে এবং তার সাথে এটিও প্রমাণ করে যে কোন এক ধনী ব্যক্তিই তা সেখানে পুঁতে রেখে গেছে, তবে সেই গুপ্তধনের উৎস সম্পর্কে কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর আগে আমাকে অবশ্যই মাটি খুঁড়ে সেই গুপ্তধন খুঁজে বের করতে হবে। এর অর্থ হল, বিবেক কোনও মানুষকে ঈশ্বরের অস্তিত্বের প্রমাণ দেওয়ার আগে, সেই মানুষকে অবশ্যই এ কথা স্বীকার করতে বাধ্য করে যে তার অন্তরের আঙিনায় ‘বিবেক’ নামক এক অমূল্য সম্পদ বিদ্যমান।

 

অনেক মানুষই এই প্রাথমিক ভিত্তিটিকে স্বীকার করে নেবেন। যদিও তারা হয়তো এর ভিন্নভাবে ব্যাখ্যা করবেন, ভিন্ন অর্থ দেবেন এবং কেউ কেউ জোর দিয়ে বলবেন যে, এর সাথে ঈশ্বরের কোনো সম্পর্ক নেই। তবে এটা সত্যি যে, এই যুক্তিটি ঠিক তাই দেখানোর চেষ্টা করেঃ একবার যদি আপনি বিবেকের কর্তৃত্বের যুক্তিটি মেনে নেন, তবে আপনাকে ঈশ্বরের অস্তিত্বের সিদ্ধান্তটিও মেনে নিতে হবে। এটি কাজ করে কীভাবে?

 

মানুষের ওপর বিবেকের কর্তৃত্ব আছে

 

প্রায় প্রতিটা মানুষ শুধু বিবেকের অস্তিত্বই নয়, বরং এর কর্তৃত্বকেও স্বীকার করে নেয়। আজকাল প্রায় যে কোনও কর্তৃত্বের বিরুদ্ধাচরণ ও সন্দেহের এই যুগে — যেখানে ‘কর্তৃত্ব’ শব্দটিকে শ্রদ্ধার পরিবর্তে অবজ্ঞার প্রতীকে পরিণত করা হয়েছে — সেখানে একটি কর্তৃত্ব এখনো টিকে আছেঃ তা হলো ব্যক্তির নিজস্ব বিবেক। এমন কোনও মানুষ পাওয়া মুশকিল যিনি এমন কথা বলবেন যে, মানুষকে তার নিজের বিবেকের বিরুদ্ধে গিয়ে পাপ করা উচিত, অন্যায় করা উচিত বা বিবেকের অবাধ্য হওয়া উচিত। 


খ্রীষ্ট মণ্ডলী, রাষ্ট্র, পিতা-মাতা বা অন্য যে কোনও কর্তৃত্বশীল সত্তার অবাধ্য হওয়া হয়তো সম্ভব, কিন্তু মানুষের পক্ষে নিজের বিবেকের অবাধ্য হওয়া একেবারেই উচিত নয়। যদি কেউ এ কথা বলতে চায় যে, তার মধ্যে বিবেক বলে কোনকিছুর অস্তিত্ব নেই, তখন বাস্তবে সে নিজেকে মানুষ বলে আর মানছে না। আমরা পশুপাখি, যন্ত্রপাতি কিংবা কম্পিউটারের কাছ থেকে নৈতিক আচরণ আশা করি না। আমারা মানুষের কাছ থেকেই একমাত্র নৈতিক আচরণ আশা করি। সুতরাং, সমস্ত মানুষ বিবেকের পরম নৈতিক কর্তৃত্ব এবং এর বাধ্যবাধকতামূলক দায়বদ্ধতাকে স্বীকার করে নিতে বাধ্য।

 

 

অনেকেই জেনে অবাক ও আনন্দিত হয় যে, সাধু থমাস অ্যাকুইনাস এ বিষয়ে তাদের সাথে একমত পোষণ করেন। তিনি বলেনঃ “যদি কোনো ক্যাথলিক লক্ষ্য করতে শুরু করেন যে, কোন গির্জা কোনো মৌলিক ও আনুষ্ঠানিকভাবে সংজ্ঞায়িত ধর্মীয় শিক্ষার ক্ষেত্রে ভুল করছে, তবে সেই গির্জায় থেকে নিজেকে ‘ক্যাথলিক’ বলে পরিচয় দেওয়াটা হবে বিবেকের বিরুদ্ধে এক গুরুতর পাপ — এক ধরনের ভণ্ডামি। পক্ষান্তরে, সেই ব্যাক্তি যদি সৎ উদ্দেশ্য নিয়ে কিন্তু আংশিক ভাবে দোষত্রুটিসহ ভুলবশত গির্জা ত্যাগ করেন, তবে তা হবে জ্ঞানের সীমাবদ্ধতা বা ত্রুটিজনিত একটি অপেক্ষাকৃত লঘু পাপ”।

 

যুক্তির প্রথম ভিত্তিটি এভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়ঃ আমার ওপর বিবেকের পরম কর্তৃত্ব রয়েছে। দ্বিতীয় ভিত্তিটি হলঃ পরম কর্তৃত্বের একমাত্র উৎস হতে পারে একটি পরম নিখুঁত ইচ্ছা বা সত্তা। আর এর থেকে এই সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় যে, এমন একটি সত্তার অস্তিত্ব রয়েছে।

 

কেউ কি দ্বিতীয় ভিত্তিটির সাথে দ্বিমত পোষণ করতে পারেন? তা করতে হলে তাকে ঈশ্বর ছাড়া বিবেকের অন্য কোনো উৎস খুঁজে বের করতে হবে। এ ক্ষেত্রে চারটি সম্ভাবনা থাকতে পারেঃ

 

১. কোনো বিমূর্ত ও নৈর্ব্যক্তিক বিষয়, যেমন—একটি ধারণা;

২. কোনো বাস্তব কিন্তু মানবস্তরের নিচে অবস্থিত বিষয়, যেমন—পশুসুলভ সহজাত প্রবৃত্তি;

৩. মানবস্তরের কোনো বিষয়, যা কিন্তু ঐশ্বরিক নয়; এবং

৪. মানবস্তরের ঊর্ধ্বে অবস্থিত কোনো বিষয়, যা এখনো ঐশ্বরিক পর্যায়ে পৌঁছায়নি।

 

অন্য কথায়, আমরা বিমূর্ত বিষয়, মানবস্তরের নিচে অবস্থিত বাস্তব বিষয়, মানবস্তরের বাস্তব বিষয় এবং মানবস্তরের ঊর্ধ্বে অবস্থিত বাস্তব বিষয়, এই চারটি সম্ভাব্য ক্ষেত্রকেই বিবেচনায় নিচ্ছি।

 

এই চারটি সম্ভবনাকে এক করে ব্যাখ্যা করা যাক!


প্রথম সম্ভাবনা আমাদের এই নির্দেশ করে যে, বিবেকের ভিত্তি হলো এমন এক নিয়ম, যার কোনো বিধায়ক বা প্রণেতা নেই। এমন অবস্থায়, আমরা একটি বিমূর্ত আদর্শ (Abstract Idea), আচরণের একটি নির্দিষ্ট ধরণের (Pattern) কাছে পুরোপুরি ভাবে দায়বদ্ধ হয়ে পড়ি। প্রশ্ন ওঠে, এই ধরনটির অস্তিত্ব কোথায় দেখা যায়? যদি এর অস্তিত্ব কোথাও নাই থাকে, তবে একজন বাস্তব মানুষ হিসেবে আমরা অবাস্তব কোনো কিছুর কর্তৃত্বের অধীন কীভাবে হতে পারি? মানুষের মতো একটি ‘বৃহত্তর’ সত্তা কীভাবে একটি ‘ক্ষুদ্রতর’ কোনো কিছুর অধীন হতে পারে? আর যদি এই ধরন (Pattern) বা ধারণাটি (Idea) মানুষের মন থেকেই উৎপত্তি হয়ে থাকে, তবে আমাদের কী এ অধিকার আছে যে, আমারা এই ধারণাটি অন্য মানুষের ওপর চাপিয়ে দেব? বা তাকে এটা মেনে নিতে বাধ্য করবো? কিন্তু যদি এটি কেবলই একটি ধারণা হয়, তবে এর পেছনে কারও ব্যক্তিগত ইচ্ছা নেই; আর যদি এটি কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তির নিজের ধারণা হয়, তবে এর পেছনে কেবল সেই ব্যক্তিরই অস্তিত্ব থাকছে। এখানে আমরা কোনো ভাবেই এমন কোনো ভিত্তি খুঁজে পাই না যা নিখুঁত, অভ্রান্ত এবং ব্যতিক্রমহীন কর্তৃত্বের দাবি রাখতে পারে। অথচ আমরা জানি, বিবেকের এমন কর্তৃত্ব আছে। তাই কারও পক্ষে নিজের বিবেকের অবাধ্য হওয়া উচিত নয়।

 

 

দ্বিতীয় সম্ভাবনাটি এ কথা বলে, বিবেক আসলে মানুষের এক জৈবিক প্রবৃত্তি। কবি ডব্লিউ এইচ অডেন (W. H. Auden) লিখেছিলেন, “আমাদের একে অপরকে ভালোবাসতেই হবে, নাতো মরতে হবে”। যারা এই দ্বিতীয় সম্ভাবনাটিতে বিশ্বাস করেন, তাদের মতে — আমরা অবচেতন (Subconsciously) ভাবেই এটা জানি; ঠিক যেমন প্রাণীরাও অবচেতনভাবে জানে যে, নির্দিষ্ট কিছু আচরণ না করলে তাদের প্রজাতি টিকে থাকতে পারে না। এ কারণেই প্রাণিজগতে মা তার সন্তানের জন্য আত্মত্যাগ করেন; আর মানুষের পরার্থপরতার পেছনেও এটিই যথেষ্ট ব্যাখ্যা। একে বলা যায় ‘দলগত প্রবৃত্তি’ (Herd Instinct)।

 

 

কিন্তু এই ব্যাখ্যার সমস্যা হলো, প্রথমটির মতোই এটিও বিবেকের কর্তৃত্বের ‘নিখুঁত’ বা ‘চূড়ান্ত’ প্রকৃতিকে ব্যাখ্যা করতে অক্ষম। কারণ আমরা জানি, কোনো কোনো বিশেষ পরিস্থিতিতে মানুষকে, যেকোনো প্রবৃত্তির অবাধ্য হওয়া উচিত। কিন্তু আমরা কখনোই মনে করি না যে, বিবেকের অবাধ্য হওয়া উচিত। মাতৃত্বের মতো প্রবৃত্তিকে সাধারণত মেনে চলাই স্বাভাবিক; কিন্তু যদি দেখা যায় যে, সন্তানকে দেশের প্রয়োজনে, বা একটি ন্যায়সংগত ও অপরিহার্য আত্মরক্ষামূলক যুদ্ধে, জীবন বিসর্জন দেওয়ার ক্ষেত্রে তার মা বাধা সৃষ্টি করছে, অথবা যদি এর ফলে অন্য কোনো মায়ের সন্তানের প্রতি অন্যায় অবিচার করা হয় বা দয়ার অভাব ঘটে, তবে সেই প্রবৃত্তি অবশ্যই মেনে চলা উচিত নয়। এমন কোনো প্রবৃত্তি নেই যা সবসময় মানুষকে মেনে চলতেই হবে।

 

প্রবৃত্তিগুলো হলো পিয়ানোর কি-বোর্ডের বিভিন্ন সুরের বোতামের মতো (সি. এস. লুইসের দেওয়া উদাহরণ অনুযায়ী); আর নৈতিক নিয়ম হলো সেই সুরলিপি বা মিউজিক শিট। একজন বাদক প্রয়োজনে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন সুর বাজানোই সঠিক বলে মনে করেন। তাছাড়া, প্রবৃত্তি দিয়ে মানুষ হিসেবে আমাদের কখন কী করা উচিত তা ব্যাখ্যা করা যায় না। আমরা বাস্তবে যা কিছু করি তাও এর মাধ্যমে পুরোপুরি বোঝা সম্ভব নয়। মানুষ সবসময় প্রবৃত্তির অনুসরণ করে না। কখনো কখনো সে অপেক্ষাকৃত দুর্বল প্রবৃত্তিকে অনুসরণ করে; যেমন — নিজের নিরাপত্তার কথা ভেবে ভয় পাওয়া সত্ত্বেও কোনো বিপন্ন ব্যক্তিকে সাহায্য করতে এগিয়ে যাওয়া। এখানে ‘দলবদ্ধ থাকার প্রবৃত্তি’ (herd instinct) ‘আত্মরক্ষার প্রবৃত্তি’র চেয়ে দুর্বল; তবুও আমাদের বিবেক — যেন কোনো এক সুরলিপির মতো — আমাদের নির্দেশ দেয়, আমরা যেন শক্তিশালী সুরটির বদলে দুর্বল সুরটিই বাজাই।

 

সততার সাথে আত্মবিশ্লেষণ করলে যে কেউ বুঝতে পারবেন যে, বিবেক আসলে কোনো জৈবিক প্রবৃত্তি নয়। মনে করুন, অ্যালার্মের শব্দে খুব ভোরে আপনার ঘুম ভাঙল এবং মনে পড়ল যে আজ সকালে আপনার এক বন্ধুকে সাহায্য করার কথা দিয়েছিলেন। তখন আপনার প্রবৃত্তি আপনাকে বিছানায় ফিরে ঘুমিয়ে পড়তে বলবে, কিন্তু প্রবৃত্তির চেয়ে সম্পূর্ণ ভিন্ন কিছু আপনার অন্তরে বলবে যে, আপনার বিছানা থেকে উঠে পড়া উচিত। এমনকি যদি দুটি প্রবৃত্তি আপনাকে বিপরীত দিকে টানে (যখন আপনি একই সাথে ক্ষুধার্ত এবং ক্লান্ত), তবে সেই দুটি প্রবৃত্তির মধ্যে দ্বন্দ্ব আর বিবেক ও প্রবৃত্তির মধ্যে হওয়া দ্বন্দ্ব, সম্পূর্ণ আলাদা বিষয়। 


সহজ কথায়, বিবেক আপনাকে বলে দেয়, কোন কাজ আপনার করা উচিত আর কোনটা উচিত নয়; অন্যদিকে, প্রবৃত্তি কেবল আপনাকে কোনো কাজ করতে তাড়না দিতে পারে, বা না দিতে পারে। মানুষের প্রবৃত্তি কোনো বিষয়কে তার আকাঙ্ক্ষার কাছে আকর্ষণীয় বা বিকর্ষণীয় করে তোলে, কিন্তু বিবেক কোনো কাজকে মানুষের পছন্দের ক্ষেত্রে একটি আবশ্যিক কর্তব্য হিসেবে দাঁড় করায়। তাতে মানুষের আকাঙ্ক্ষা বা প্রবৃত্তি সে বিষয়ে যাই বলুক না কেন। আমি মনে করি, অধিকাংশ মানুষই, তারা যদি সৎ হন, তবে আত্মবিশ্লেষণলব্ধ এই স্পষ্ট সত্যটিকে স্বীকার করে নিতে আপত্তি জানাবেন না। তবে কেউ যদি এই যুক্তিকে এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন, তবে তাকে তার নিজের প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হবে; যদি তিনি সৎ মানুষ হন, তবে একা থাকার সময় তিনি নিশ্চয়ই এই সত্যটির মুখোমুখি হবেন।

 

 

তৃতীয় সম্ভাবনা এ কথা বলে, “অন্য মানুষ (বা সমাজ) হলো বিবেকের কর্তৃত্বের মূল উৎস”। এটা সবচেয়ে প্রচলিত ধারণা হলেও, ‘মানুষের বিবেকের উৎসের’ চারটি সম্ভাব্য ব্যাখ্যার মধ্যে এটাই সবচেয়ে দুর্বল। কারণ, সমাজ মানে অন্য মানুষদের ঊর্ধ্বে থাকা কোনো সত্তা না; যদিও অনেকে সমাজকে ঠিক ঈশ্বরের মতোই গণ্য করেন। এমনকি কথা বলার সময়ও, অনেক মানুষ যখন ‘সমাজ’ শব্দটি উচ্চারণ করেন, তখন কণ্ঠস্বর ফিসফিসানি পর্যায়ে নেমে আসে, যেন তারা কোনো পবিত্র নাম উচ্চারণ করছেন! অথচ সমাজ মানে তো কেবল আমার মতোই অন্য মানুষ।


আমার ওপর কী অন্য মানুষের কর্তৃত্ব থাকতে পারে? তারা কী সবসময় সঠিক? আমি কী কখনোই তাদের প্রতি অবাধ্য হতে পারব না? নাৎসি যুগে একজন জার্মান কী সমাজের সব আদেশ মেনে চলতেন? সমাজই যে বিবেকের উৎস — এমন কথা বলার অর্থ হলো, একজন বন্দি যখন হাজারো বন্দিতে পরিণত হয়, তখন তারাই বিচারকের আসনে বসে যায়। এর মানে দাঁড়ায়, কেবল সংখ্যা গরিষ্ঠতাই সর্বচ্চ কর্তৃত্বের জন্ম দিচ্ছে; অর্থাৎ, একজন ব্যক্তির অন্তরে তার নিজস্ব বিবেক, তার কোনো গুরুত্ব নেই, বরং সমাজ (অর্থাৎ, অনেক ব্যক্তির সমষ্টি) যা সঠিক বলে মনে করে, সেটিই মেনে নিতে হবে। 


এটা যৌক্তিকভাবে অসম্ভব; এটা অনেকটা এমন ভাবনার মতো, যদি অনেকগুলো পাথর জড়ো করা যায়, তবে সেগুলো চিন্তা করতে শুরু করবে। প্রসঙ্গত, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (Artificial Intelligence) কিছু সমর্থক ঠিক ওই ধরনের যৌক্তিক ভ্রান্তিতেই বিশ্বাস করেন — তাদের মতে, ইলেকট্রন, চিপ বা ধাতব টুকরোগুলোকে যদি সঠিক জ্যামিতিক ও গাণিতিক বিন্যাসে যথেষ্ট পরিমাণে একত্রিত করা যায়, তবে সেগুলোও মানুষের মতো চিন্তা করতে সক্ষম হবে।

 


সর্বশেষ, চতুর্থ সম্ভাবনা এ কথা বলে — “বিবেকের কর্তৃত্বের উৎস এমন কিছু, যা আমার ঊর্ধ্বে কিন্তু তা ঈশ্বর নয়” । এটা কী হতে পারে? সমাজ আমার ঊর্ধ্বে নয়, সহজাত প্রবৃত্তিও নয়। তাহলে কী কোনো আদর্শ? এটি তো সেই প্রথম সম্ভাবনার মতো, যা নিয়ে আমরা আগেই আলোচনা করেছি। মনে হচ্ছে, এই ক্ষেত্রে আসলে ব্যাখ্যা করবার মতো কিছুই নেই।

 

তাহলে যা অবশিষ্ট থাকে, তা হল ঈশ্বর। যেকোনো ঈশ্বর নয়, বরং বাইবেলে বর্ণিত নৈতিক ঈশ্বর। প্রাচীন জাতিগুলোর মধ্যে কেবল ইহুদিরাই তাদের ঈশ্বরকে নৈতিক বাধ্যবাধকতার উৎস হিসেবে চিহ্নিত করেছিল। পৌত্তলিকদের দেবতারা হয়তো আচার-অনুষ্ঠানের দাবি করতেন, মানুষের মনে ভয়ের সঞ্চার করতেন, মহাবিশ্ব সৃষ্টি করেছিলেন কিংবা মানবজীবনের ঘটনাবলি নিয়ন্ত্রণ করতেন; কিন্তু তাদের কেউই তাদের জাতিকে কখনো ‘দশ আজ্ঞা’ (Ten Commandments) প্রদান করেননি অথবা এমন কথা বলেননি যে, “তোমরা পবিত্র হও, কারণ আমি, তোমাদের প্রভু ঈশ্বর, পবিত্র।” ইহুদিরা প্রকৃতির উৎস এবং বিবেকের উৎসকে অভিন্ন বলে মনে করত। আর তা হল স্বয়ং ঈশ্বর। খ্রীষ্টান ধর্মাবলম্বীরাও এই উপলব্ধিকে উত্তরাধিকারসূত্রে লাভ করেছে। ইহুদিদের ‘ঈশ্বরের মনোনীত জাতি’ হওয়ার দাবিটি এই উপলব্ধিকে সবচেয়ে বিনম্রভাবে ব্যাখ্যা করে। এটি মানুষের বুদ্ধিমত্তার ফসল নয়, বরং ঐশ্বরিক প্রকাশ। এই দাবিটিকে অত্যন্ত যৌত্তিক। কিন্তু কীভাবে?

 

 

এই যুক্তিটিকে সংক্ষেপে ও সারমর্মের দিক দিয়ে ব্যাখ্যা করলে দাঁড়ায় — “মানুষের ওপর বিবেকের এক নিরঙ্কুশ, ব্যতিক্রমহীন ও বাধ্যতামূলক নৈতিক কর্তৃত্ব আছে, যা তার কাছ থেকে নিঃশর্ত আনুগত্য দাবি করে। আর কেবল একটি পরিপূর্ণ মঙ্গলময় ও ন্যায়পরায়ণ ঐশ্বরিক ইচ্ছারই এমন কর্তৃত্ব থাকতে পারে এবং নিরঙ্কুশ ও ব্যতিক্রমহীন আনুগত্য পাওয়ার অধিকার থাকতে পারে। সুতরাং, বিবেক হলো ঈশ্বরের ইচ্ছারই কণ্ঠস্বর।”

 

সত্যের সন্ধানে বিবেক গড়ে তুলতে হবে


মানুষ সবসময় সেই কণ্ঠস্বর সঠিকভাবে শুনতে পায় না। মানুষের বিবেক ভুল করতে পারে। এই কারণেই বিবেকের তাড়নায় মানুষের প্রথম দায়িত্ব হলো — সত্যের সন্ধান করে নিজের বিবেককে গড়ে তোলা। বিশেষ করে, এই সত্যটা অনুসন্ধান করা যে, ঈশ্বর কি আমাদের জন্য কোনো স্পষ্ট নৈতিক দিক নির্দেশনা (বাইবেল বা খ্রীষ্টমণ্ডলী) প্রদান করেছেন কি না? যদি তাই হয়, তবে যখনই আমাদের বিবেক সেই নির্দেশনার প্রতি অবাধ্য হতে বলে, তখন বুঝতে হবে যে আমাদের বিবেক সঠিকভাবে কাজ করছে না। আর বিবেকের মাধ্যমেই আমরা একথা বুঝতে পারি, যদি আমরা মনে রাখি যে বিবেক কেবল তাৎক্ষণিক কোনো অনুভূতি নয়। যদি আমাদের তাৎক্ষণিক অনুভূতিগুলোই ঈশ্বরের কণ্ঠস্বর হতো, তবে আমাদের হয় বহুদেববাদী হতে হতো, নয়তো ধরে নিতে হতো যে ঈশ্বর নিজেই মানসিক দ্বন্দ্বে (Schizophrenic) ভুগছেন।