নাস্তিকদের উভয়সংকটঃ মহাবিস্ফোরণ তত্ত্ব, বিবর্তনবাদ, পূর্বনির্ধারণবাদ এবং নৈতিক বিচার
যা ঘটে, তা ন্যায়সংগতভাবেই
ঘটে
বিখ্যাত রোমান সম্রাট এবং
স্টোইক (Stoic)
দার্শনিক, মার্কাস অরেলিয়াস (Marcus
Aurelius) রোমের ইতিহাসে অন্যতম শ্রেষ্ঠ ও ন্যায়পরায়ণ শাসক হিসেবে
বেশ জনপ্রিয়। তিনি বলেছেনঃ “মনে রেখো, যা
কিছু ঘটে, তা ন্যায়সংগতভাবেই ঘটে; মনোযোগ
দিয়ে লক্ষ্য করলে তুমি নিজেই তা বুঝতে পারবে…” “তোমার কি কিছু ঘটেছে? তবে যাই ঘটে থাকুক না কেন,
মহাবিশ্বের শুরু থেকেই তোমার সাথে সে সবকিছু ঘটবে বলে নির্ধারিত হয়ে আছে এবং তোমার ভাগ্যের
সাথে তা গেঁথে দেওয়া হয়েছে”। (Meditations, Book IV, 10,26)
তিনি কী বোঝাতে চান?
যে সকল দার্শনিকদের লেখা ও তাদের শিক্ষামূলক
কথা আমি পড়েছি, সেই পছন্দের তালিকায় আছেন মার্কাস অরেলিয়াস। ইতিহাসের একজন নামকরা সম্রাট হয়েও তিনি যে সব জ্ঞানের কথা মানুষকে
জানিয়ে গেছেন তা অনবদ্য। তবে তাঁর এই বক্তব্য নাস্তিকদের বা ঈশ্বর-অবিশ্বাসী চিন্তার
মানুষকে বেশ বেকায়াদায় ফেলতে পারে। এটা আমি মনে করি। নাস্তিকরা ঈশ্বর মানেন না। বা
ঈশ্বরের অস্তিত্বে বিশ্বাস করেন না। তারা প্রায়ই বলে থাকেন যে, ঈশ্বরের অস্তিত্বের
যথেষ্ট প্রমাণ নেই। কিন্তু প্রমাণ বলতে তারা আসলে যা দাবী করেন, তা ঈশ্বরের অস্তিত্বকে
প্রমাণ করতে সক্ষম নয়। এই জগতে সবকিছুই প্রমাণ করা সম্ভব, কিন্তু সবকিছু প্রমাণ করার
জন্য কেবলমাত্র একটি নির্দিষ্ট মানদণ্ড, মাপকাঠি কিংবা পদ্ধতি ব্যাবহার করা যায়না।
আমি কি বা কোন বিষয়কে প্রমাণ করতে চাই, তার বৈশিষ্ট্য জেনে, সে অনুযায়ী মানদণ্ড বা
মাপকাঠি ব্যাবহার করতে হবে।
মার্কাস অরেলিয়াসের জীবনদর্শন
নাস্তিকদের দৃষ্টিভঙ্গির বিপরিত
নাস্তিকদের প্রশ্নগুলো ঠিক এই রকম, যদি
ঈশ্বর থাকেন, তাহলে জগতে মন্দের অস্তিত্ব কেন আছে? ভালো মানুষের সাথে খারাপ কিছু কেন
ঘটে? যদি ঈশ্বর সর্বশক্তিমান হয়ে থাকেন, তবে তিনি খারাপ কিছু কেন ঘটতে দেন? নারীরা
কেন ধর্ষিত হয়? যারা ধর্ষণ করে, ঈশ্বর তাদের কেন শাস্তি দেন না? অসৎ মানুষেরা কেন ভালো
থাকে?
সত্যি বলতে, আমি নিজেও এইসব নিয়ে ভেবেছি।
প্রশ্নগুলো ন্যায়সঙ্গত। এড়ানো যায়না। একজন মানুষ নাস্তিক হোক বা আস্তিক, আমাদের সকলের
মনেই কখনও না কখনও এই প্রশ্নগুলো এসছে। কখন কী ভেবে দেখেছেন, কেন আমাদের মনে এই ধরণের
প্রশ্ন আসে? তার কারণ, যা কিছু ঘটে, মানুষ হিসেবে আমাদের সবকিছুর একটা গ্রহণযোগ্য যৌক্তিক
ব্যাখার প্রয়োজন। নাস্তিকরা যেহেতু ধর্মীয় বা ঐশ্বরিক ব্যাখ্যা গ্রহণ করে না, তবুও
তাদের একটা ব্যাখ্যার প্রয়োজন থাকে। সেটা সম্ভবত বৈজ্ঞানিক, প্রাকৃতিক বা বিবর্তনের
মতবাদ।
এখন নাস্তিকদের দৃষ্টিভঙ্গিতেই কিছু ঘটনা
ব্যাখ্যা করবার চেষ্টা করি। ধরুন একজন ব্যাক্তিকে হত্যা করা হয়েছে। যে তাকে হত্যা করেছে,
সে তার এক পরিচিত মানুষ। যদি আমরা এই ঘটনার কারণ জানতে চাই, তবে এটা জানা হবে যে, যে
তাকে হত্যা করেছে তা কেনই বা হত্যা করেছে। হত্যাকারীকে জেরা করলেই আমরা সেটা জানতে
পারবো এবং আনুসাঙ্গিক প্রমাণ তার সাথে জোগাড় করে নিতে পারবো। কিন্তু এই ব্যাখ্যা তো
নাস্তিক বা আস্তিক, দুজনের কাছেই আছে। আমরা যে ব্যাখ্যা জানতে চাই তা হল “চরম ব্যাখ্যা”
(Ultimate Justification)। অর্থাৎ, জগতে যা কিছু ঘটছে তা কেন ঘটছে? নাস্তিকরা বিবর্তনবাদে
বিশ্বাসী। বিবর্তনীয় জীববিজ্ঞান (Evolutionary Biology) এবং বিবর্তনীয় মনস্তত্ত্বের (Evolutionary Psychology) প্রধান দাবিই হলো—মানুষের বাহ্যিক গঠন (তার হাত, পা, চোখ) যেভাবে বিবর্তনের মাধ্যমে তৈরি হয়েছে,
ঠিক তেমনি মানুষের আচরণ, স্বভাব, আবেগ এবং অনেক মানসিক গুনাগুণও টিকে থাকার লড়াইয়ে বিবর্তনের ফল।
এখন আমরা যদি বিবর্তনীয় মতবাদের এই দাবীগুলো সত্য বলে মেনে নিই, তবে আমাদের মেনে নিতে হবে যে, হত্যা বা ধর্ষণের মতো ঘটনাগুলো টিকে থাকার লড়াইয়ে বিবর্তনের ফল। তাই আমরা এটিকে সামাজিক অন্যায়, অপরাধ বলে গণ্য করতে পারিনা। একজন নাস্তিক হয়তো এই কথায় আপত্তি জানিয়ে বলতে পারে, বিবর্তন কখনই মানুষকে ধর্ষণ বা হত্যা করার স্বভাব দিতে পারেনা। কিন্তু এটা তার ব্যাক্তগত দাবী, প্রমাণ নয়। বিবর্তন টিকে থাকার লড়াইয়ে কাকে কী গুণাগুণ দেবে, সেটা তো নাস্তিকরা ঠিক করতে পারেনা! তাই না?
এটা হতেই পারে যে, বিবর্তন একজন মানুষকে টিকে থাকার লড়াইয়ে হত্যা
বা ধর্ষণ করার মতো ক্ষমতা ও গুণাগুণ দিয়েছে, তাই তো সে এটা করতে পারছে, আর যাকে সে
ক্ষমতা দেওয়া হয়নি, সে ওটা করেও না। বিবর্তনের কাছে হত্যা বা ধর্ষণ কী একটা অপ্রাকৃতিক
ব্যাপার? ডারউইনের বিবর্তনবাদ সে কথা বলে না। তেমন হলে, তাহলে মানবসমাজের শুরু থেকেই
মানুষের মধ্যে এই স্বভাব থাকতো না। মানুষের বর্তমান যত স্বভাব, সবই বিবর্তনের ফলাফল।
এটাই তো বিবর্তনীয় মতবাদের মূল দাবী। অতএব, নাস্তিকদের এ কথা
মেনে নিতেই হবে, মানুষের যত অন্যায়, অপকর্ম কিংবা অপরাধ, তার সেই স্বভাবগত বৈশিষ্ট্যের
বহিঃপ্রকাশ, যা লক্ষ লক্ষ বছরের বিবর্তনের উত্তরধিকার সূত্রে পাওয়া।
আমার প্রশ্ন, যদি সেই ব্যাক্তি কোনও এক
পশুর হাতে নিহত হতো তখন আমরা এই ব্যাপারটা কী ভাবে ব্যাখ্যা করতাম? দুর্ঘটনা বলাতাম,
তাই তো? যখন একটা প্রাণী অন্য প্রাণীর হাতে প্রাণ হারাচ্ছে, তা তো প্রাকৃতিক নিয়মের
অধীনেই ঘটছে?
নাস্তিক বা বিবর্তনবাদীরা এখানে এই কথা বলবেন, মানুষ আর বন্য পশুর মধ্যে এক
বিশাল বিবর্তনীয় পার্থক্য আছে। বন্য পশুদের ভালো-মন্দের
বিচার করার বা নৈতিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার মতো উন্নত মস্তিষ্ক নেই। বিবর্তনের ধারায়
মানুষের মস্তিষ্ক এত উন্নত হয়েছে যে মানুষের মধ্যে ‘যুক্তি’
(Reason) এবং ‘সহানুভূতি’ (Empathy) তৈরি হয়েছে।
এখানে কয়েকটা গুরুতর প্রশ্ন থেকে যাচ্ছেঃ
বিবর্তনের ধারায় বেছে বেছে শুধুমাত্র মানুষেরই মস্তিক উন্নত হল, যাতে সে ভালো-মন্দের বিচার বা নৈতিক সিদ্ধান্ত পারে? অন্য বন্য পশুপাখিরা এই
সুযোগ থেকে বাদ গেল কেন? মানুষ যেমন বিবর্তনের ফল, বন্য প্রাণীরাও তেমনই। প্রকৃতির
দৃষ্টিতে সমস্ত জীবই সমান। তবে মানুষ এত অগ্রাধিকার পেল কীভাবে? কিসের ভিত্তিতে প্রকৃতি
এমনটা করলো?
এইসব প্রশ্নের যুক্তিসঙ্গত ব্যাখ্যা নাস্তিক
বা বিবর্তনবাদীদের পাওয়া যায় না। মনে হয় যেন, বিবর্তন ইচ্ছাকৃত ভাবেই অন্যান্য বন্য-প্রাণীদের
সাথে পক্ষপাত করে মানুষকে একটু বেশি প্রধান্য দিয়েছে। বিবর্তন কোনো
সচেতন সত্তা নয় যার নিজস্ব মন, ইচ্ছা বা পক্ষপাত করার ক্ষমতা
আছে। নাস্তিক বা বিবর্তনবাদীদের সংজ্ঞায়, বিবর্তন বা প্রকৃতিক
নিয়ম একটি সম্পূর্ণ প্রাকৃতিক প্রক্রিয়া। বিবর্তনের একমাত্র নিয়ম
হলো—যেভাবে হোক পরিবেশে টিকে থাকা এবং বংশবৃদ্ধি করা। কিন্তু আজকাল মানুষের মধ্যে যে স্বভাব দেখা যায়, তা বিবর্তনবাদের বিপক্ষেই
সাক্ষ্য দেয়। যেমন, বর্তমান প্রজন্মের মধ্যে বিয়ে করার প্রবণতা বা সন্তান জন্ম দেওয়ার
ইচ্ছা অনেক কমে গেছে। তাছারা সারা বিশ্বে গর্ভপাতের হার চোখে পড়ার মতো।
যা কিছু ঘটে, তা মহাবিশ্বের শুরু থেকেই
পূর্বনির্ধারিত
যদি আমরা মহাবিশ্বের (Universe) সূচনার
কারণ হিসেবে বৈজ্ঞানিক ভাবে মহাবিস্ফোরণের (Big Bang) সংজ্ঞা মেনে নিই, তবে আমাদের
এও মেনে নিতে হবে যে, যা কিছু ঘটছে এবং জগতের অন্তিম সময় পর্যন্ত যা কিছু ঘটবে, তা
সবই পূর্বনির্ধারিত (Predetermined)।
বিজ্ঞান বলে, আজ থেকে কোটি কোটি বছর আগে (প্রায় ১৩.৭ বিলিয়ন বছর আগে) আমাদের পরিচিত এই বিশাল মহাবিশ্ব, সমস্ত গ্রহ, নক্ষত্র, আকাশগঙ্গা, সবকিছুই একটি ছোট্ট বিন্দুর মতো জায়গায় নাকি
জমাট বেঁধেছিল। সেই বিন্দুটি ছিল প্রচণ্ড গরম এবং ঘন। হঠাৎ করে সেই
বিন্দুটি এক প্রচণ্ড শক্তির মাধ্যমে বিস্ফোরিত হয় এবং চারদিকে প্রসার করতে শুরু করে। একেই বলা হয় মহাবিস্ফোরণ। এর অর্থ হল, ‘সময়’ বলতে
আমরা যা বুঝি, তখনই সে তার অস্তিত্ব পেয়েছিল।
পদার্থবিজ্ঞান এবং বিশ্বখ্যাত বিজ্ঞানী আলবার্ট আইনস্টাইনের সাধারণ আপেক্ষিকতার তত্ত্ব (Theory
of General Relativity) অনুযায়ী, স্থান (Space)
এবং সময় (Time) একে অপরের সাথে ওতপ্রোতভাবে
জড়িত। মহাবিস্ফোরণের আগে যেহেতু কোনো স্থান বা পদার্থ ছিল না, তাই তখন ‘সময়’ বলেও
কিছু ছিল না। বিখ্যাত নাস্তিক বিজ্ঞানী স্টিফেন হকিং এই
কথার উপর একটা উদাহরণ দিয়েছিলেন। তিনি বলেছিলেন, “পৃথিবীর উত্তর মেরুর (North Pole) আরও উত্তরে কী
আছে—এই প্রশ্নটি যেমন অর্থহীন, ঠিক তেমনি মহাবিস্ফোরণের আগে ঠিক
কী ছিল বা তখন সময় কেমন ছিল, সেই প্রশ্নটিও
অর্থহীন।” কারণ উত্তর মেরু থেকেই যেমন উত্তর দিক শুরু হয়,
ঠিক তেমনি মহাবিস্ফোরণ থেকেই সময়ের শুরু হয়েছে।
মহাবিস্ফোরণের তত্ত্ব সৃষ্টি করলো এক
গভির দার্শনিক সংকট
আধুনিক বিজ্ঞান যখন আমাদের জানিয়ে দিল,
মহাবিস্ফোরণের কারণে এই মহাবিশ্বের সৃষ্টি হল, তখন এটা কেবলমাত্র পদার্থবিদ্যার সমীকরণেই সীমাবদ্ধ থাকল না। এটা জন্ম
দিল এক গভীর দার্শনিক সংকটের। দার্শনিকগণ ও চিন্তাবিদরা এমন কিছু প্রশ্ন ছুঁড়ে
দিলেন, যা মানুষকে ভাবিয়ে তোলে। এই প্রশ্নগুলো, মানুষের স্বাধীন চিন্তা, স্বাধীন
চেতনা, ভালো মন্দের বিচার বোধ এবং ন্যায় অন্যায়ের মাপকাঠিকে শেষমেশ অর্থহীন বলে প্রমাণ
করে। যদি আমরা বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিকোণ থেকে মহাবিস্ফোরণকেই
(Big Bang) এই মহাবিশ্বের পরম সূচনার মূল কারণ
হিসেবে মেনে নিই, তবে কার্যকারণ তত্ত্বের (Causality)
এক অমোঘ নিয়মে আমাদের এই সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে হয় যে—জগতের সেই
সূচনা লগ্ন থেকে শুরু করে জগতের অন্তিম সময় পর্যন্ত যা কিছু ঘটবে, তা সবই সৃষ্টির সেই আদি মুহূর্তেই
পূর্বনির্ধারিত (Predetermined) হয়ে গেছে।
এর অর্থ হলঃ
১. একজন মানুষ যখন কোনকিছু চিন্তা করছে,
সে আসলে নিজে থেকে তা করছে না, বরং নিজে থেকেই চিন্তাগুলো তার মস্তিস্কের মধ্যে ঘটে
চলেছে।
২. একজন মানুষ যখন কোনও ব্যাপারে সিধান্ত
নিচ্ছে, সে আসলে নিজে থেকে সেই সিধান্ত নিচ্ছে না, বরং জগতের অমোঘ পূর্বনির্ধারিত নিয়মেই
সে ওই সিধান্ত নিচ্ছে।
অতএব, এই সিধান্তে আসতে পারি যে, মানুষ
হিসেবে আমরা যে সকল ঘটনাকে ভালো বা মন্দ বলে বিবেচনা করি, তা সবই অর্থহীন। যখন একজন
মানুষকে হত্যা করা হয়, তখন আমাদের মেনে নিতে হবে মহাবিশ্বের সূচনার সেই আদি মুহূর্তে
এই ঘটনা পূর্বনির্ধারিত ছিল। যখন একজন নারী ধর্ষিত হয়, কিংবা একটা দেশের উপর পারমাণবিক
বোমা নিক্ষেপ করা হয়, বা কোথায় সন্ত্রাসি হামলায় অসংখ্য মানুষ মারা যায়, সে সবই পূর্বনির্ধারিত
ছিল। তাই একজন নাস্তিক যখন এই অভিযোগ আনেন যে, “ঈশ্বরের অস্তিত্ব থাকলে জগতে মন্দের
অস্তিত্ব থাকতো না, তখন সে পক্ষান্তরে এটা মেনে নিচ্ছে যে ঈশ্বরবিহীন জগতে সমস্ত মন্দের
অস্তিত্ব ন্যায়সঙ্গত।”
নিউটনের ধ্রুপদী
বলবিজ্ঞান প্রমাণ করে, জগতে যা কিছু ঘটে সে সবই পূর্বনির্ধারিত
আমরা যদি এমন এক মহাবিশ্বের কল্পনা করি,
যার উৎসের কারণ ঈশ্বর নয়, তবে বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিতে আমাদের স্বীকার করতেই হয়, জগতে ভালো
মন্দ যা কিছুই ঘটে তা সবই পদার্থবিজ্ঞানের নিয়ম অনুসারেই ঘটে। কারণ ধ্রুপদী
বলবিজ্ঞান (Classical Mechanics) বা নিউটনীয় বলবিজ্ঞানের
দৃষ্টিকোণ থেকে পূর্বনির্ধারণবাদ (Predeterminism) শতভাগ
নিখুঁত এবং গাণিতিকভাবে প্রমাণিত। এই তত্ত্ব অনুযায়ী, মহাবিশ্ব
একটি বিশাল, জটিল এবং স্বয়ংক্রিয় যন্ত্র ছাড়া আর কিছুই নয়।
১. নিউটনের পরম
কার্যকারণ তত্ত্ব নীতি
পদার্থবিজ্ঞানী আইজ্যাক
নিউটনের গতিসূত্রের মূল কথাই হলো—কারণ ছাড়া কোনো কার্য
ঘটে না। কেউ যদি একটা পাথরকে
নির্দিষ্ট কোণে এবং নির্দিষ্ট শক্তিতে ছুঁড়ে দেয়, তবে সেই
পাথর ঠিক কোথায় গিয়ে পড়বে তা পদার্থবিদ্যার সূত্র দিয়ে একদম
নিখুঁতভাবে হিসাব করা সম্ভব। ধ্রুপদী বলবিজ্ঞান বলে, মহাবিশ্বের
প্রতিটি কণা (তা কোনো নক্ষত্র হোক বা মানুষের শরীরের একটি পরমাণু) ঠিক একইভাবে এই নির্দিষ্ট নিয়ম মেনে চলে। তাই
এই মহাবিশ্বে ‘কাকতালীয়’ বা ‘হঠাৎ অলৌকিক’ বলে কিছু
ঘটার সুযোগ নেই।
২. বিজ্ঞানী পিয়ের-সিমন ল্যাপলাসের
দানব
১৮১৪ সালে ফরাসি গণিতবিদ ও
বিজ্ঞানী পিয়ের-সিমন ল্যাপলাস ধ্রুপদী বলবিজ্ঞানের এই সূত্রকে একটি কাল্পনিক ধারণার মাধ্যমে তুলে ধরেন, যা
বিজ্ঞানের ইতিহাসে “ল্যাপলাসের দানব” (Laplace's
Demon) নামে পরিচিত। ল্যাপলাস বলেছিলেন, যদি
কোনো এক মহাশক্তিশালী সত্তা মহাবিশ্বের সৃষ্টির আদি মুহূর্তে প্রতিটি পরমাণুর সঠিক
অবস্থান (Position) এবং গতিবেগ (Momentum) জানতে পারে, তবে তার পক্ষে নিউটনের সূত্র ব্যবহার
করে মহাবিশ্বের অতীত এবং ভবিষ্যতের যেকোনো মুহূর্তের সব ঘটনা
সম্পূর্ণ নিখুঁতভাবে গণনা করা সম্ভব।
পদার্থবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে যদি নিউটনের ধ্রুপদী বলবিজ্ঞানকে আমরা পরম সত্য বলে মেনে
নিই, তবে মহাবিস্ফোরণের সূচনার আদি মুহূর্ত থেকে শুরু করে এর অন্তিম সময় পর্যন্ত মহাবিশ্বে যা কিছু ঘটবে, তা এক চুলও এদিক-ওদিক হওয়ার সুযোগ
নেই। আপনার মস্তিষ্কে এখন যে নিউরনের আদান-প্রদান ঘটছে,
তাও ধ্রুপদী পদার্থবিদ্যার নিয়মেই হচ্ছে—যার রিমোট কন্ট্রোলটি আসলে
লুকিয়ে আছে কোটি কোটি বছর আগের সেই মহাবিস্ফোরণের আদি
কণাগুলোর বিন্যাসের মধ্যে।
সর্বশেষ যুক্তিগত সিধান্ত
আমরা জানি যুক্তিবিদ্যা
(Logic) সবসময় কার্যকারণ সম্পর্কের (Causality) ওপর নির্ভরশীল। যুক্তি দিয়ে বিচার করলে পূর্বনির্ধারণবাদ
(Predeterminism) অত্যন্ত শক্তিশালী এবং এতে ভুলের কোন
জায়গা নেই, যদি আমরা নিচের যুক্তি শৃঙ্খলাটি (Syllogism) মেনে নিই:
Premise A (আদি শর্ত):
মহাবিস্ফোরণ হলো মহাবিশ্বের সমস্ত পদার্থ, অনু এবং শক্তির আদি
বিন্যাস।
Premise B (প্রাকৃতিক
নিয়ম): মহাবিশ্বের সমস্ত ঘটনা (মহাকাশ গঠন হওয়া থেকে শুরু করে মানুষের মস্তিষ্কের নিউরনের
রাসায়নিক ক্রিয়াকলাপ) নির্দিষ্ট কিছু ভৌত ও রাসায়নিক নিয়ম
মেনে চলে, যা অপরিবর্তনীয়।
Conclusion (উপসংহার):
যেহেতু সৃষ্টির
আদি শর্তগুলি নির্দিষ্ট এবং প্রাকৃতিক
নিয়মগুলো অপরিবর্তনীয়, সেহেতু এই দুইয়ের মিথস্ক্রিয়ায় উৎপন্ন
হওয়া প্রতিটি ফলাফলও নির্দিষ্ট এবং একটিমাত্র দিকেই চলতে বাধ্য।
অতএব, এই যুক্তি বলছে,
যদি মহাবিশ্বের সৃষ্টিতে ঐশ্বরিক কোনো শক্তির হস্তক্ষেপ না থাকে, তবে মহাবিস্ফোরণের
সেই প্রথম ধাক্কাতেই ইতিহাসের শেষ পাতায় সেই সব ঘটনাই পর পর সাজিয়ে
গুছিয়ে লেখা হয়ে গেছে, যা এই বিশ্বসংসারে এবং মানবসমাজে ঘটবে।
শেষের কথা
নাস্তিকরা এটা মানতে অস্বীকার করেন যে, মহাবিশ্ব এবং এই মহাবিশ্বে যা কিছুর অস্তিত্ব তা সবই ঈশ্বরের রচনা। তারা মহাবিশ্বের সৃষ্টির কারণ হিসেবে মহাবিস্ফোরণ ( Big Bang) এবং সকল প্রাণীর উৎপত্তির কারণ হিসেবে বিবর্তনবাদের (Evolution) ব্যাখ্যা দিয়ে থাকেন। কিন্তু আমরা জানলাম যে, এই সকল ব্যাখ্যা গভির কিছু দার্শনিক ও যুক্তিগত সংকটের সৃষ্টি করে, যা কোনও মীমাংসা হয় না। যদি আমরা নাস্তিকদের ও বস্তুবাদী বিজ্ঞানীদের সৃষ্টিতত্ত্বের সংজ্ঞা মেনে নিই, তবে আমাদের সমাজ থেকে বিচার ব্যাবস্থা তুলে দিতে হবে। কারণ যারা সমাজে যারা অপরাধ করে, তারা প্রকৃতপক্ষে কেউই অপরাধী নয়। বরং তাদের সমস্ত কাজকর্ম মহাবিশ্বের পূর্বলিখিত নিয়তি। কোনও মানুষের সাথে যত খারাপ কিছু ঘটুক না কেন, তার কথা ভেবে আমাদের দুঃখ করে লাভ নেই। কারণ এই জগত, এই বিশ্ব সংসার এবং প্রকৃতি নিখুঁত নিয়মের মেনেই চলে। তাই এখানে ভুলের কোন জায়গা নেই।
একজন নারী যখন ধর্ষিত হয়, তখন বুঝতে হবে, এই জগত তার সাথে ন্যায্য বিচার করেছে। এক শিশু যখন না খেতে পেয়ে মারা যায়, তখন ধরে নিতে হবে, তার সাথে প্রকৃতি ন্যায়বিচার করেছে। এইসব ঘটনা দেখে দুঃখ পেলে চলবে না, রাগ করলেও চলবে না; বা অন্য কারও প্রতি অভিযোগ বা দোষারোপ করলেও চলবে। যদি আপনি তেমন মানুষের মধ্যেই পড়েন, যারা বিশ্বাস করেন, মহাবিস্ফোরণ ( Big Bang) এবং বিবর্তনবাদ (Evolution)। কারণ দার্শনিক বলেছেনঃ “মনে রেখো, যা কিছু ঘটে, তা ন্যায়সংগতভাবেই ঘটে; মনোযোগ দিয়ে লক্ষ্য করলে তুমি নিজেই তা বুঝতে পারবে…” “তোমার কি কিছু ঘটেছে? তবে যাই ঘটে থাকুক না কেন, মহাবিশ্বের শুরু থেকেই তোমার সাথে সে সবকিছু ঘটবে বলে নির্ধারিত হয়ে আছে এবং তোমার ভাগ্যের সাথে তা গেঁথে দেওয়া হয়েছে”। (Meditations, Book IV, 10,26)
