ভূমিকা

গ্যালিলিও এবং ক্যাথলিক চার্চকে ঘিরে যে প্রচলিত বিতর্ক দীর্ঘকাল থেকে চলে আসছে, তা নিয়ে আমার লেখার ইচ্ছা বহু পুরনো। অনেক মানুষ, বিশেষ ভাবে ক্যাথলিক চার্চের সমালোচক যারা, বা যারা ক্যাথলিক চার্চের বিরোধিতা করেন, তাদের মূল বক্তব্যঃ “ক্যাথলিক চার্চ গ্যালিলিওকে নির্যাতন করেছে। তার কারণ গ্যালিলিও তার বৈজ্ঞানিক গবেষণা দ্বারা চার্চ ও খ্রীষ্টধর্মের সিধান্তগুলোকে ভুল প্রমাণ করেছে!”। কিন্তু কী সেই বিষয়, যার কারণে গ্যালিলিও কে নাকি ক্যাথলিক চার্চের হাতে নির্যাতিত হতে হল? মজার ব্যাপার, এর সঠিক ব্যাখ্যা সমালোচকদের কাছেও নেই। যারা কিনা ক্যাথলিক চার্চের বিরুদ্ধে এই গুরুতর অভিযোগ আনেন, তাদের যদি এই পুরো বিষয়টি সঠিক ভাবে বুঝিয়ে বলতে বলা হয়, তারা হোঁচট খাবে। এমনকি অনেক খ্রীষ্টানরাও এই নিয়ে ক্যাথলিক চার্চকে নিন্দা করে। এর কারণ হল, অপপ্রচার এবং ঐতিহাসিক ঘটনার প্রেক্ষাপটে পুরো বিষয়কে যাচিয়ে না দেখা। 


ইন্টারনেটে খুঁজলে আপনি বহু ওয়েবসাইট ও ভিডিও পাবেন, যেখানে বোঝানো হয়েছে, গ্যালিলিও বিজ্ঞানের পথ দেখিয়ে মানবজাতির জন্য কত মঙ্গল করেছেন, আর সেই মঙ্গলে বাধা সৃষ্টি করেছে খ্রীষ্টধর্ম ও ক্যাথলিক চার্চ। অনেকেই আমাকে তেমন সব ভিডিও ও ওয়েবসাইটের লিঙ্ক পাঠিয়েছেন, আর বলেছেনঃ “দেখো, ক্যাথলিক চার্চের আসল রুপ!”। ভালো কথা। সত্য জানতে ক্ষতি নেই। ঠিক করলাম, গ্যালিলিও আর ক্যাথলিক চার্চের এই ব্যাপারটা নিয়ে পড়াশুনা করবো।

 

বিভিন্ন সূত্র, ক্যাথলিক চার্চের সেই সময়কার নথিপত্র এবং আক্যাডেমিক স্তরের বেশ কিছু লেখালিখি পড়ে যা বুঝলাম, তাতে দেখা গেল গ্যালিলিও ও ক্যাথলিক চার্চ বিতর্কের পুরো ব্যাপারটাই আসলে অতিরঞ্জিত এবং বেশিরভাগই ভুল তথ্যে ভরা। গ্যালিলিও আর ক্যাথলিক চার্চের ঘটনাটিকে সুন্দর করে প্রলেপ লাগিয়ে অন্য এক রুপ দেওয়া হয়েছে। এমন এক আখ্যান (Narrative) তৈরি করা হয়েছে, যেখানে ক্যাথলিক চার্চকে বিজ্ঞান বিরোধী খলনায়ক (Villain) হিসেবে দেখানো হয়েছে আর গ্যালিলিওকে দেখানো হয়েছে শিকার (Victim) হিসেবে। এটা ইচ্ছাকৃত ভাবেই করা হয়েছে। 


প্রশ্ন উঠতে পারে, কেনই বা কেউ ইচ্ছাকৃত ভাবে এমন এক আখ্যান তৈরি করতে যাবে? এতে কার কী লাভ? এমন ঘটনা আমাদের সমাজে নতুন নয়। অনেক সময় যা প্রচারিত হয়, বাস্তব তার থেকে ভিন্ন হয়। যারা গ্যালিলিও ও ক্যাথলিক চার্চকে নিয়ে এমন আখ্যান রচনা করেছে, তাদের একটা সুনির্দিষ্ট রাজনৈতিক পরিচয় রয়েছে। তারা যে নির্দিষ্ট রাজনৈতিক মতাদর্শের অনুসরণ করে থাকে, সেই মত অনুসারে ধর্ম ও ঈশ্বর, তাদের দৃষ্টিতে অপ্রয়োজনীয় বিষয়। তারা নাস্তিকতা, বিজ্ঞানবাদ ও মানবকেন্দ্রিক এক সামাজিক ধারণার প্রচারক। তারা এমন এক সমাজের কল্পনা করে, যেখানে ধর্ম ও ঈশ্বরের অস্তিত্ব থাকবে না। আমি এখানে সেই রাজনৈতিক মতাদর্শের নাম আর উল্লেখ করছি না।

 

অনেক ক্যাথলিকদের কাছে এই বিষয়টা অস্বস্তির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। আমি তাদের বলতে চাই যে, বিষয়টা এমন ভাবে দেখার কোনো প্রয়োজন নেই। সত্যিটা একবার জানা হয়ে গেলে, যেকোনো বিতর্কই তখন খণ্ডনযোগ্য বলে মনে হয়। এই প্রবন্ধে, আমি কয়েকটা গুরুত্বপূর্ণ তথ্য তুলে ধরেছি, যা গ্যালিলিও এবং ক্যাথলিক চার্চকে ঘিরে যে প্রচলিত বিতর্ক আছে, তা খণ্ডন করতে সাহাজ্য করবে। এই বিষয় নিয়ে এটা আমার প্রথম প্রবন্ধ বলে ধরে নিলে কোন আপত্তি নেই। পরবর্তীকালে এ নিয়ে আরও কয়েকটা প্রবন্ধ লেখার ইচ্ছা আছে।

 

গ্যালিলিওর সংক্ষিপ্ত পরিচয়

যে মানুষটিকে নিয়ে এত আলোচনা, এত বিতর্ক, তার সম্বন্ধে একটু জানা দরকার। গ্যালিলিও গ্যালিলের জন্ম হয় ১৫৬৪ খ্রীষ্টাব্দের ১৫ ফেব্রুয়ারি, ইতালির টুস্কানিতে অবস্থিত পিসা নামের এক শহরে। তার বাবা ভিনসেঞ্জো গ্যালিলি একজন গণিতজ্ঞ এবং সংগীতশিল্পী ছিলেন। তার মায়ের নাম গিউলিয়া আমানাতি। গ্যালিলিও ও তার বাবা মা ক্যাথলিক ছিলেন। বেশ অল্প বয়স থেকেই গ্যালিলিও পড়ালেখা করতে শুরু করেছিলেন। গ্যালিলিওর বয়স যখন ১১ বছর, তখন তাকে ফ্লোরেন্সের কাছে ভালম্ব্রোসার কামাল্ডোলিস নামের ক্যাথলিক মঠে পড়াশোনার জন্য পাঠানো হয়। মঠের সন্ন্যাসীদের জীবনের দৃষ্টান্ত দেখে, ১৫৭৮ সালের দিকে তরুণ গ্যালিলিও ক্যাথলিক চার্চের সেবায় জীবন উৎসর্গ করার উদ্দেশ্যে সেখানে একজন শিক্ষানবিশ সন্ন্যাসী হিসেবে যোগ দিয়েছিলেন। তবে তাঁর বাবা ভিনসেঞ্জো চেয়েছিলেন তাঁর ছেলে যেন একজন চিকিৎসক হন; তাই তিনি গ্যালিলিওকে সেই মঠ থেকে ফিরিয়ে নিয়ে আসেন। প্রাথমিক শিক্ষার পর তিনি পিসা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন, কিন্তু আর্থিক অসচ্ছলতার কারণে তাকে তার পড়াশোনা বন্ধ করে দিতে হয়।

 

পরে ১৫৮৯ খ্রীষ্টাব্দে গ্যালিলিও পিসা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনার জন্য একটি পদ পান এবং সেখানে তিনি নিয়মিত গণিত পড়ানো শুরু করেন। এর পরপরই তিনি পাদোয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে চলে যান এবং সেখানকার অনুষদে জ্যামিতি, বলবিজ্ঞান এবং জ্যোতির্বিজ্ঞান নিয়ে ১৬১০ খ্রীষ্টাব্দ পর্যন্ত অধ্যাপনা করেন। তিনি এক সময় পথভ্রষ্ট হন ও নিজের নৈতিক চরিত্র হারিয়ে ফেলেন। গ্যালিলিও, মারিনা গ্যামবা নামে এক মহিলার সাথে অবৈধ সম্পর্কে জড়িয়ে পরেন এবং বিবাহ না করেই পরপর তিনটি সন্তানের পিতা হয়েছিলেন। খ্রীষ্টধর্মে এমন সম্পর্ককে ব্যাভিচার বলেই গণ্য করা হয়। তার দুটি কন্যা (ভার্জিনিয়া ও লিভিয়া) ও এক পুত্র (ভিনসেঞ্জিও) সন্তান ছিল। এর ফলে সমাজে তার দুর্নাম হয়েছিল। গ্যালিলিওকে আধুনিক জ্যোতির্বিজ্ঞানের জনক, আধুনিক পদার্থবিজ্ঞানের জনক এবং এমনকি আধুনিক বিজ্ঞানের জনক হিসেবেও আখ্যায়িত করা হয়ে থাকে। গ্যালিলিও ১৬৪২ খ্রীষ্টাব্দের ৮ই জানুয়ারি, ইতালির ফ্লোরেন্সের নিকটবর্তী আর্কাত্রি শহরে ৭৭ বছর বয়সে নিজের বাড়িতে মারা যান।

 

বিতর্কের মূল কারণ কী?

ক্যাথলিক বিরোধীরা এমনটা মনে করেন যে, সৌরজগতের ভূকেন্দ্রিক বা Geocentric (পৃথিবী কেন্দ্রে অবস্থিত) ধারণা ত্যাগ করে সূর্যকেন্দ্রিক বা Heliocentric (সূর্য কেন্দ্রে অবস্থিত) ধারণা গ্রহণ করার জন্য ক্যাথলিক চার্চ গ্যালিলিওকে নির্যাতন করেছিল। এ বিষয়ে নিচে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে।

 

সমালোচকদের আপত্তিঃ ক্যাথলিক চার্চ বিজ্ঞান ও বিজ্ঞান চর্চার বিরোধী

যে কেউ এ কথা প্রচার করে বা বিশ্বাস করে, সে চূড়ান্ত ভাবে বিভ্রান্ত। ক্যাথলিক চার্চ বিজ্ঞানবিরোধী, এটা ঐতিহাসিক ভাবে অসত্য। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে ক্যাথলিক চার্চ নানা রকমের বৈজ্ঞানিক প্রচেষ্টা ও গবেষণাকে সমর্থন করে এসেছে। গ্যালিলিওর সময় কালে রোমে জেসুইট যাজকদের (Jesuit Priests) একটি অত্যন্ত সম্মানিত জ্যোতির্বিজ্ঞানী ও বিজ্ঞানীদের গোষ্ঠী ছিল। এছাড়া, অনেক প্রখ্যাত বিজ্ঞানীগণ ক্যাথলিক চার্চ এবং এর বিভিন্ন উচ্চপদস্থ ব্যাক্তিদের কাছ থেকে উৎসাহ ও আর্থিক সহায়তা পেয়েছিলেন। সেই সময়ে অর্জিত অনেক বৈজ্ঞানিক অগ্রগতির পেছনে হয় ক্যাথলিক চার্চের যাজকদের অবদান ছিল, অথবা সেগুলো ক্যাথলিক চার্চের দেওয়া আর্থিক অনুদানের ফলেই সম্ভব হয়েছিল।

 

নিকোলাস কোপার্নিকাস তাঁর সবচেয়ে বিখ্যাত গ্রন্থ ‘অন দ্য রেভোলিউশন অফ দ্য সেলেস্টিয়াল অরবস’ (On the Revolution of the Celestial Orbs)—যেখানে তিনি সূর্যকেন্দ্রিক বিশ্বতত্ত্বের (Heliocentrism) এক চমৎকার ব্যাখ্যা দিয়েছিলেন—পোপ তৃতীয় পলের উদ্দেশ্যে উৎসর্গ করেছিলেন। কোপার্নিকাস সেই বইটির মুখবন্ধ লেখার দায়িত্ব দিয়েছিলেন আন্দ্রেয়াস ওসিয়ান্ডার নামের এক লুথেরান যাজককে। 


ওসিয়ান্ডার জানতেন যে, এই তত্ত্বের প্রতি প্রোটেস্ট্যান্টদের প্রতিক্রিয়া নেতিবাচক হতে পারে, কারণ মার্টিন লুথার এই নতুন তত্ত্বটিকে নিন্দা করেছিলেন। গ্যালিলিওর দশ বছর আগে জোহানেস কেপলার সূর্যকেন্দ্রিক বিশ্বতত্ত্ব বিষয়ক একটি গ্রন্থ প্রকাশ করেন, যা কোপার্নিকাসের গবেষণার সম্প্রসারিত রূপ ছিল। এর ফলে, কেপলার তাঁর নিজের প্রোটেস্ট্যান্ট সম্প্রদায়ের মানুষের কাছ থেকে তীব্র বিরোধিতার মুখে পড়েন; অন্যদিকে, বৈজ্ঞানিক গবেষণায় সফলতার জন্য পরিচিত কিছু জেসুইট যাজকের কাছ থেকে তিনি উষ্ণ অভ্যর্থনাও পেলেন।

 

 

সমালোচকদের আপত্তিঃ ক্যাথলিক চার্চ বিজ্ঞানের চাইতে ধর্মীয় পরম্পরাকে অধিক গুরুত্ব দেয়

ক্যাথলিক-বিরোধীরা গ্যালিলিওর এই ঘটনাটিকে এমন একটি উদাহরণ হিসেবে সমাজের সামনে তুলে ধরেন, যেখানে বোঝানো হয় ক্যাথলিক চার্চ পুরোনো বা ভুল শিক্ষা ত্যাগ করতে অস্বীকার করে একটি তথাকথিত প্রাচীন “ঐতিহ্য” আঁকড়ে থাকতে চায়। তারা এ কথা বুঝতে চান না যে, সেসময়ে গ্যালিলিওর বিচারের দায়িত্বে থাকা ক্যাথলিক চার্চই যে কেবল মহাবিশ্ব সম্পর্কে ভূ-কেন্দ্রিক (Geocentric) ধারণায় যে অবিশ্বাসী ছিল এমনটা নয়; বরং তৎকালীন বিজ্ঞানীদের মধ্যেও এই ধারণাই প্রচলিত ছিল।

 

এর বহু শতাব্দী আগে অ্যারিস্টটল সূর্যকেন্দ্রিক বিশ্বতত্ত্বের (Heliocentric) মতবাদকে খণ্ডন ও অস্বীকার করেছিলেন। গ্যালিলিওর সময়কালে প্রায় সকল প্রধান চিন্তাবিদই ভূকেন্দ্রিক বিশ্বতত্ত্বের (Geocentric) মতবাদে বিশ্বাস করতেন। এমনকি সহকর্মীদের উপহাসের শিকার হওয়ার আশঙ্কায়, কোপার্নিকাস তাঁর সূর্য-কেন্দ্রিক তত্ত্বটি কিছুকাল প্রকাশ করতে চাননি। অবশ্য পরে তিনি তাঁর তত্ত্ব প্রকাশ করেছিলেন। ক্যাথলিক চার্চ তাঁর এই তত্ত্বটির বিরোধিতা করেনি।

 

অনেকেই বিশ্বাস করেন, গ্যালিলিও তাঁর সূর্যকেন্দ্রিক বিশ্বতত্ত্বের (Heliocentric) মতবাদ প্রমাণ করেছিলেন। অথচ, এই মতবাদের বিরুদ্ধে অ্যারিস্টটলের দেওয়া সবচেয়ে শক্তিশালী যুক্তিটির কোনো উত্তর গ্যালিলিওর কাছে ছিল না। অ্যারিস্টটলের যুক্তি ছিলঃ “যদি সূর্য-কেন্দ্রিক মতবাদ সত্য হতো, তবে পৃথিবী যখন সূর্যের চারদিকে তার কক্ষপথে আবর্তিত হয়, তখন নক্ষত্রগুলোর অবস্থানে দৃশ্যমান ‘প্যারালাক্স’ বা স্থানচ্যুতি ঘটার কথা ছিল”। কিন্তু গ্যালিলিওর সময়ের প্রযুক্তিতে নক্ষত্রগুলোর অবস্থানে এমন কোনো পরিবর্তন লক্ষ্য করা যায়নি। 


নক্ষত্রগুলো পৃথিবী থেকে অত্যন্ত দূরে অবস্থিত হওয়ায়, তাদের এই স্থানচ্যুতি শনাক্ত করার জন্য তৎকালীন সময়ের চেয়ে অনেক বেশি সংবেদনশীল ও শক্তিশালী এক পরিমাপক যন্ত্রের প্রয়োজন ছিল। তাই সেই সময় পর্যন্ত প্রাপ্ত প্রমাণগুলো থেকে মনে করা হতো যে, পৃথিবীর সাপেক্ষে নক্ষত্রগুলো তাদের অবস্থানে স্থির রয়েছে—অর্থাৎ পৃথিবী বা নক্ষত্রগুলো মহাকাশে গতিশীল নয়, কেবল সূর্য, চাঁদ এবং গ্রহগুলোই গতিশীল। এদিকে কোপার্নিকাসের তত্ত্ব অনুযায়ী, প্যারালাক্স বা স্থানচ্যুতি দৃশ্যমান না হওয়ার মূল কারণ হিসেবে নক্ষত্রগুলোর বিশাল দূরত্বের কথা উল্লেখ করা হয়েছে, কিন্তু সেসময়ের অধিকাংশ জ্যোতির্বিজ্ঞানীই এই ব্যাখ্যায় আশ্বস্ত হতে পারেননি। এটিই ছিল প্রধান কারণ, যার ফলে প্রখ্যাত জ্যোতির্বিজ্ঞানী টাইকো ব্রাহে কোপার্নিকাসের তত্ত্বকে পুরোপুরি গ্রহণ করতে অস্বীকার করেছিলেন।

 

গ্যালিলিও যদি চাইতেন তবে তিনি তাঁর সূর্য-কেন্দ্রিক মতবাদটিকে কেবল একটি তত্ত্ব বা গ্রহগুলোর গতিবিধিকে সহজভাবে ব্যাখ্যা করার একটি পদ্ধতি হিসেবে উপস্থাপন করতে পারতেন, তাতে কোনো সমস্যা হতো না। জটিলতা তখনই সৃষ্টি হলো, যখন তিনি এই তত্ত্বকে শুধু একটি বৈজ্ঞানিক তত্ত্ব হিসেবেই নয়, বরং এটিকে একটি ‘ধ্রুব সত্য’ হিসেবে প্রচার করতে শুরু করলেন—অথচ সেই সময়ে এর সপক্ষে তাঁর কাছে কোনও চূড়ান্ত প্রমাণ ছিল না। তা সত্ত্বেও, গ্যালিলিও যদি শুধুমাত্র বিজ্ঞানের গণ্ডির মধ্যে থাকতেন এবং ধর্মতত্ত্বের ক্ষেত্রে প্রবেশ না করতেন, তবে তাঁকে এত বড় বিপদে পড়তে হতো না। কারণ তিনি তাঁর তত্ত্বকে বাইবেল দ্বারা প্রমাণসিদ্ধ করা শুরু করেছিলেন। গ্যালিলিও বাইবেল জানতেন, ক্যাথলিক ধর্মতত্ত্বের বিষয়েও তাঁর জ্ঞান কিছু কম ছিল না। কিন্তু ধর্মতত্ত্ব ও বিজ্ঞান এক পর্যায়ে পড়ে না। এই দুটো বিষয়কে ব্যাখ্যা করার নিজস্ব আনুশাসন (Discipline) রয়েছে।

 

১৬১৪ সালে, গ্যালিলিও এমন এক অভিযোগের কৈফিয়ত দিতে বাধ্য হন, যেখানে বলা হল এই “নতুন বিজ্ঞান” পবিত্র বাইবেলের কিছু অংশের পরিপন্থী। তাঁর বিরোধীরা বাইবেলের এমন কিছু অংশের দিকে নির্দেশ করলেন, যেখানে বলা হয়েছেঃ “তখন সূর্য স্থির হয়ে দাঁড়াল, আর চাঁদও দাঁড়িয়ে রইল...” (ইসাইয়া ১০:১৩)। এটি কোনো বিচ্ছিন্ন বিষয় নয়। সামসঙ্গীত ৯৩ ও ১০৪ এবং উপদেশক ১:৫ অধ্যায়েও মহাজাগতিক গতি এবং পৃথিবীর স্থিরতা নিয়ে কথা বলা হয়েছে। তাদের মতে, সূর্যকেন্দ্রিক মতবাদ (Heliocentric Theory) গ্রহণ করলে, এই শাস্ত্রাংশগুলোর আক্ষরিক ব্যাখ্যা বর্জন করতে হবে। 


তবে ক্যাথলিক চার্চের কাছে এটি কোনো সমস্যা হওয়ার কথা নয়। সাধু অগাস্টিন বলেছেন, “সুসমাচারে এমন কোথাও লেখা নেই যে প্রভু বলেছেন: ‘আমি তোমাদের কাছে এমন এক সহায়ক কে (Paraclete) পাঠাব, যিনি তোমাদের সূর্য ও চন্দ্রের গতিপথ সম্পর্কে শিক্ষা দেবেন।’ কারণ তিনি চেয়েছিলেন তাদের খ্রীষ্টান হিসেবে গড়ে তুলতে, গণিতবিদ হিসেবে নয়।” অগাস্টিনের দৃষ্টান্ত অনুসরণ করে, গ্যালিলিও বাইবেলের এই উক্তিগুলোর তিনি পবিত্র বাইবেলের আক্ষরিক ব্যাখ্যা দেওয়ার ক্ষেত্রে সকলকে সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়েছিলেন।

 

দুঃখের বিষয়, ক্যাথলিক চার্চের ইতিহাসে এমন বহু ব্যাক্তি ছিলেন যারা বাইবেলকে তার প্রকৃত উদ্দেশ্যের চেয়ে বেশি আক্ষরিক অর্থে পড়বার ওপর জোর দিয়েছেন। উদাহরণস্বরূপ, সেসব মানুষ বুঝতে ভুল করেছেন যে, পবিত্র বাইবেলে অনেক ক্ষেত্রে ‘ফেনোমেনোলজিক্যাল’ (Phenomenological) বা বাহ্যিক অবলোকন-নির্ভর ভাষা ব্যবহার করা হয়েছে—অর্থাৎ, যা যেমন দেখা যায়, ঠিক সেভাবেই তাকে বর্ণনা করা হয়েছে। ঠিক যেমন আমরা আজও বলি যে সূর্য ওঠে ও অস্ত যায়—যার ফলে দিন ও রাত হয়—অথচ বাস্তবে পৃথিবী ঘোরে; প্রাচীনকালের মানুষও ঠিক সেভাবেই কথা বলত। পৃথিবী থেকে দেখলে মনে হয় সূর্য উঠছে, আবার অস্ত যাচ্ছে, আর পৃথিবী স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। যখন আমরা কোনো বিষয়কে তার বাহ্যিক রূপ অনুযায়ী বর্ণনা করি, তখন আমরা আসলে ‘ফেনোমেনোলজিক্যাল’ ভাষা ব্যবহার করছি।

 

মহাকাশের গতি এবং পৃথিবীর স্থিরতা বিষয়ক এই ‘ফেনোমেনোলজিক্যাল’ ভাষাটি আধুনিক যুগে আমাদের কাছে অত্যন্ত স্পষ্ট, কিন্তু আগেরকার দিনে তা এতটা স্পষ্ট ছিল না। ক্যাথলিক চার্চের শাস্ত্রজ্ঞরা এটি বিবেচনা করতে প্রস্তুত ছিলেন যে, কোনো নির্দিষ্ট উক্তি আক্ষরিক অর্থে নেওয়া উচিত নাকি বাহ্যিক অবলোকন-নির্ভর অর্থে। কিন্তু গ্যালিলিওর মতো একজন ব্যক্তি—যিনি শাস্ত্রজ্ঞ ছিলেন না—তিনি যখন পবিত্র বাইবেলের কোনো অংশকে একটি নির্দিষ্ট অর্থেই গ্রহণ করতে বলেন, তখন তারা গ্রহণযোগ্য বলে মেনে নিতে পারেননি। এই একই আচরণ বিজ্ঞানীদের মধ্যেও দেখা যায়। এমন কোনও ব্যাক্তি, যিনি নিজে বিজ্ঞানী নন, তিনি যখন তাঁর কোনও মতবাদ বা তত্ত্বকে, বৈজ্ঞানিক ভাষার এক নির্দিষ্ট অর্থেই গ্রহণ করতে বলেন, তখন বিজ্ঞানীরা তা সমর্থন করেন না।

 

সেই সময়ে, পবিত্র বাইবেলের ব্যক্তিগত ব্যাখ্যা প্রচার করা এক অত্যন্ত সংবেদনশীল বিষয় ছিল। সপ্তদশ শতাব্দীর শুরুর দিকে ক্যাথলিক চার্চ সবেমাত্র ‘রিফরমেশন’ বা ধর্মসংস্কার আন্দোলনের অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে পার হয়েছিল। সেই সময়ে প্রোটেস্ট্যান্টদের সাথে চার্চের অন্যতম প্রধান বিরোধের কারণই ছিল বাইবেলের ব্যক্তিগত ব্যাখ্যা নিয়ে।

 

যাই হোক, সাধারণ কোনো ব্যক্তির ব্যাখ্যার ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠা সূর্যকেন্দ্রিক তত্ত্বকে (Heliocentric Theory) গ্রহণ করতে ধর্মতাত্ত্বিকরা প্রস্তুত ছিলেন না। গ্যালিলিও যদি তাঁর আলোচনাকে জ্যোতির্বিজ্ঞানের স্বীকৃত সীমার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখতেন এবং সূর্যকেন্দ্রিক তত্ত্বটিকে ‘একমাত্র বাস্তব সত্য’ হিসেবে দাবি না করতেন, তবে পরিস্থিতি এতটা জটিল হতো না—এক্ষেত্রে সন্দেহের অবকাশ খুব কমই থাকে। এতকিছুর পরেও, তিনি নতুন এই তত্ত্বটিকে কোনো যুক্তিসঙ্গত সন্দেহের ঊর্ধ্বে গিয়ে প্রমাণ করতে পারেননি।

 

গ্যালিলিও ক্যাথলিক চার্চের বিরোধিতা করলেন

গ্যালিলিও পোপ পঞ্চম পলের (সময়কাল ১৬০৫-১৬২১) সাথে দেখা করতে রোমে গেলেন। পোপ এই বিষয়টি ‘হোলি অফিস’-এর (ধর্মীয় বিচার বিভাগ) কাছে হস্তান্তর করেন, যারা ১৬১৬ সালে গ্যালিলিওর তত্ত্বের অসহমতি জানিয়ে একটি আদেশ জারি করে। যদিও কিছুদিনের জন্য পরিস্থিতি মোটামুটি শান্ত হয়ে আসে, কিন্তু গ্যালিলিও নিজেই আবার এক সংঘাতময় জটিল পরিস্থিতির সৃষ্টি করে বসলেন।

 

গ্যালিলিওর অনুরোধে কার্ডিনাল রবার্ট বেলারমাইন—যিনি একজন জেসুইট এবং তৎকালীন ক্যাথলিক ধর্মতাত্ত্বিকদের মধ্যে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব ছিলেন—তাঁকে একটি সনদপত্র প্রদান করেন। এই সনদে গ্যালিলিওকে সূর্যকেন্দ্রিক তত্ত্ব (Heliocentric Theory) গ্রহণ বা সমর্থন করতে নিষেধ করা হলেও, এই তত্ত্ব নিয়ে গবেষণা ও অনুসন্ধান করতে বাধা দেওয়া হয়নি। ১৬২৩ সালে গ্যালিলিও নতুন পোপ অষ্টম আরবান-এর সাথে সাক্ষাৎ করেন। এই পোপ, যিনি গ্যালিলিওর দীর্ঘদিনের বন্ধু ছিলেন, তাকে সূর্যকেন্দ্রিক বিশ্বতত্ত্বের (Heliocentric Theory) ওপর একটি গ্রন্থ রচনার অনুমতি দিলেন। তবে তিনি সতর্ক করে দিলেন যে, গ্যালিলিও যেন এই নতুন মতবাদকে প্রমাণ না দেখিয়ে সরাসরি সমর্থন না করেন, বরং এর পক্ষে ও বিপক্ষে যে যুক্তিগুলো রয়েছে, কেবল সেটাই উপস্থাপন করবেন। 


গ্যালিলিও যখন ‘ডায়ালগ অন দ্য টু ওয়ার্ল্ড সিস্টেমস’ (Dialogue on the Two World Systems) গ্রন্থটি রচনা করেন, তখন তিনি পোপের দেওয়া একটি যুক্তিকে তার বইয়ের চরিত্র ‘সিমপ্লিসিও’-র মুখে বসিয়ে দেন। এমন কাজ করে গ্যালিলিও সেই ব্যক্তিকেই উপহাস করে বসলেন, যার পৃষ্ঠপোষকতা তার জন্য অত্যন্ত প্রয়োজন ছিল। এছাড়া, জেসুইট সম্প্রদায়ের একজন জ্যোতির্বিজ্ঞানীর সমালোচনা করে তিনি তার দীর্ঘদিনের সমর্থক—জেসুইটদের—সাথেও সুসম্পর্ক নষ্ট করে ফেলেন। তাঁর এইসব কাজকর্মের কারণেই, সেই কুখ্যাত বিচার প্রক্রিয়াটি শুরু হয়, যা আজও বিজ্ঞান ও ধর্মের চূড়ান্ত বিচ্ছেদের প্রতীক হিসেবে গণ্য হয়ে থাকে।

 

গ্যালিলিওকে ক্যাথলিক চার্চ নির্যাতন করেছিল?

অবশেষে, গ্যালিলিও তাঁর সূর্যকেন্দ্রিক বিশ্বতত্ত্বের (Heliocentric Theory) মতবাদ প্রত্যাহার করে নিয়েছিলেন। তবে তাঁকে যে কোনো কঠোর কারাবাস বা নির্যাতনের মুখে পড়তে হয়েছিল, তা কিন্তু নয়। যদিও তেমটাই প্রচার করা হয়ে থাকে। প্রকৃতপক্ষে, গ্যালিলিওর সাথে আশ্চর্যজনকভাবে ভালো আচরণই করা হয়েছিল।

 

অনেকেই বিজ্ঞানের বিশিষ্ট ইতিহাসবিদ জর্জিও ডি সান্তিলানার (Giorgio de Santillana) কথা জানেন। ইনি ক্যাথলিক চার্চের বিশেষ এক অনুরাগী ছিলেন না। ১৯৫৫ সালে প্রকাশিত তাঁর অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ ‘দ্য ক্রাইম অফ গ্যালিলিও’, তে তিনি মন্তব্য করেছেন, “বরং রোমান ক্যাথলিক কর্তৃপক্ষের সতর্কতা এবং আইনি খুঁটিনাটি মেনে চলার প্রবণতার প্রশংসা করা উচিত।” তাঁর গবেষণালব্ধ জ্ঞান তাঁকে এই সিধান্তে আসতে বাধ্য করে যে, গ্যালিলিওর বিচার কোনো আইনবহির্ভূত বা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত দমন অভিযান ছিল না, বরং এটি ছিল একটি সুবিন্যস্ত ও আনুষ্ঠানিক আইনি প্রক্রিয়া। যদিও গ্যালিলিওকে গৃহবন্দি জীবনে থাকতে হয়েছিল, তবুও তাঁর এই জীবনযাপন কে সহজ করে তোলার জন্য সম্ভাব্য সব ধরনের সুযোগ-সুবিধা দেওয়া হয়েছিল। তাঁর উপর আদৌ কোনোদিন শারীরিক কিংবা মানসিক অত্যাচার করা হয়নি।

 

ভ্যাটিকানে নিযুক্ত টাস্কানির রাষ্ট্রদূত এবং গ্যালিলিওর ঘনিষ্ঠ বন্ধু নিকোলিনি রোমের ঘটনাবলি সম্পর্কে নিয়মিত টাস্কানির রাজদরবারে প্রতিবেদন পাঠাতেন। গ্যালিলিওর তথাকথিত ‘কারাবাস’ বা বন্দিদশার পরিস্থিতি সম্পর্কে নিকোলিনি টাস্কানির রাজাকে লিখে পাঠিয়েছিলেনঃ “পোপ আমাকে বলেছেন যে, তিনি গ্যালিলিওর প্রতি এমন সদয় আচরণ করেছেন যা অন্য কারও ক্ষেত্রে কখনো করা হয়নি” (১৩ ফেব্রুয়ারি, ১৬৩৩ তারিখের চিঠি); “তাঁর একজন সেবক আছে এবং তার সব ধরনের সুযোগ-সুবিধা রয়েছে” (১৬ এপ্রিলের চিঠি); এবং “পোপ বলেছেন, রায় ঘোষণার পর তিনি আমার সাথে আলোচনা করবেন যে, কীভাবে গ্যালিলিওকে যথাসম্ভব ভালো ভাবে রাখা যায়” (১৮ জুনের চিঠি)।

 

নথিপত্র থেকে এ কথা জানা যায় যে, ‘দ্য ডিরেক্টরি ফর ইনকুইজিটরস’ (নিকোলাস আইমেরিক, ১৫৯৫)-এ উল্লিখিত নিয়মাবলির কারণে গ্যালিলিওর ওপর নির্যাতন চালানো সম্ভব ছিল না। সে যুগে ইউরোপের আইনি ব্যবস্থায় অপরাধীদের শাস্তি দেওয়ার সরঞ্জাম উপস্থিত ছিল। কিন্তু ক্যাথলিক চার্চের হস্তক্ষেপের কারণে ইউরোপের আইনি দণ্ডবিধানে গ্যালিলিওর শাস্তি হয়নি। 


তার অন্যতম কারণ ছিল ‘হোলি অফিস’ (Holy Office) এর—অর্থাৎ ক্যাথলিক চার্চের যে বিভাগটি এ ধরনের বিষয়গুলো দেখাশোনা করার দায়িত্বে ছিল, তারাই গ্যালিলিওর এই মামলা নিজেদের হাতে রেখেছিল। গ্যালিলিওর সময়কালে ইউরোপের অনেক মানুষজন, অনেক চিন্তাবিদ, ও সমাজের গণ্যমান্য বহু ব্যক্তিরা গ্যালিলিওর মৃত্যু কামনা করেছিল। ক্যাথলিক চার্চের হাতে এই বিষয়টি না থাকলে, গ্যালিলিওকে সত্যিই মরতে হতো।

 

বিখ্যাত বিজ্ঞানী ও দার্শনিক আলফ্রেড নর্থ হোয়াইটহেড (Alfred North Whitehead) যথার্থই বলেছেন—এমন এক যুগে যখন নিউ ইংল্যান্ডে প্রোটেস্ট্যান্টরা অনেক ‘ডাইনি’কে নির্যাতন ও মৃত্যুদণ্ড দিয়েছিল, তখন বিজ্ঞানীদের ক্ষেত্রে যা ঘটেছিল তা হলঃ “গ্যালিলিওকে কেবল সম্মানজনক বন্দিদশা এবং মৃদু তিরস্কারের মুখোমুখি হতে হয়েছিল।” (দ্য অরিজিনস অফ মডার্ন সায়েন্স, ১৯২৫)

 


ক্যাথলিক চার্চ তো ‘অব্যর্থ’ (Infallible)? তবে এর দ্বারা ভুল কীভাবে হয়?

অনেকেই, এমনকি অনেক ক্যাথলিকরা এর অর্থ বোঝে না। ক্যাথলিক চার্চের অব্যর্থতা (Infallibility Of The Catholic Church) হলো একটি ধর্মতাত্ত্বিক বিশ্বাস। এই বিশ্বাস বলে, পবিত্র আত্মার বিশেষ সহায়তায়, বিশ্বাস ও নৈতিকতার বিষয়ে সুনিশ্চিত মতবাদকে শিক্ষা দেওয়া বা প্রচার করার সময় ক্যাথলিক চার্চ যে কোন ভুলভ্রান্তি থেকে সুরক্ষিত।

 

এই ধর্মতাত্ত্বিক বিশ্বাস ব্যক্তিগত পাপহীনতা (Impeccability) বা সর্বজ্ঞতা থেকে আলাদা এক বিষয়। এর মানে, একজন পোপ বা বিশপ ব্যক্তিগত পর্যায়ে ভুল করতে পারেন, পাপ করতে পারেন অথবা ত্রুটিপূর্ণ ব্যক্তিগত মতামত দিতে পারেন। ‘অব্যর্থতা’ (Infallibility) বিষয়টি কেবল সুনির্দিষ্ট ও কঠোরভাবে সংজ্ঞায়িত শর্তাবলির অধীনে ক্যাথলিক চার্চের আনুষ্ঠানিক শিক্ষাপ্রদানকারী কর্তৃপক্ষ বা ‘ম্যাজিস্টেরিয়াম’ (Magisterium)-এর ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য।

 

গ্যালিলিওর বিচারকারী দশজন কার্ডিনালের মধ্যে তিনজন রায়ে স্বাক্ষর করতে অস্বীকার করা সত্ত্বেও, শেষ পর্যন্ত তাঁর মতবাদকে প্রত্যাখ্যান করা হয়। এই কারণে অনেক ক্যাথলিক-বিরোধী প্রায়ই দাবি করেন যে, গ্যালিলিওর দোষী সাব্যস্ত হওয়া এবং পরবর্তীকালে তাঁর পুনর্বাসন—পোপের ‘অব্যর্থতা’ (Papal Infallibility) সংক্রান্ত ক্যাথলিক চার্চের ধর্মতাত্ত্বিক বিশ্বাসকে ভুল প্রমাণ করে। কিন্তু এটা সঠিক নয়, কারণ গ্যালিলিওর সূর্যকেন্দ্রিক বিশ্বতত্ত্বের (Heliocentric Theory) মতবাদের বিষয়ে পোপ কখনোই কোনো ‘অব্যর্থ’ রায় প্রয়োগ করেননি।

 

এটা জানা দরকার যে, ক্যাথলিক চার্চ কখনোই গ্যালিলিওর বিচারকারী ট্রাইব্যুনালের মতো সাধারণ বিচারিক সংস্থাগুলোকে ‘অব্যর্থ’ বলে দাবি করেনি। ক্যাথলিক চার্চের ট্রাইব্যুনালগুলোর কেবল শৃঙ্খলাগত ও বিচারিক কর্তৃত্ব রয়েছে; তবে এগুলো বা এদের দেওয়া কোনো সিদ্ধান্তই ক্যাথলিক চার্চের আইনে ‘অব্যর্থ’ বলে গণ্য নয়।

 

তাছাড়াও, গ্যালিলিওর বিষয়ে কোনো ‘Ecumenical Council (বিশ্বজনীন ধর্মসভা) অনুষ্ঠিত হয়নি এবং এই আলোচনার কেন্দ্রে পোপ ছিলেন না; বরং পুরো বিষয়টি ‘হোলি অফিস’ (Holy Office)-এর মাধ্যমে পরিচালিত হয়েছিল। ‘হোলি অফিস’ তাদের কাজ শেষ করলে, পোপ অষ্টম আরবান (Urban VIII) সেই রায় অনুমোদন করেন, কিন্তু তিনি সেখানে নিজের ‘অব্যর্থতা’ (Papal Infallibility) প্রয়োগ করেননি।

 

পোপের ‘অব্যর্থতা’ (Papal Infallibility) প্রয়োগ করার শর্ত

পোপের পক্ষে ‘অব্যর্থতা’র বিশেষ ক্ষমতা (Charism Of Infallibility) প্রয়োগের জন্য তিনটি শর্ত পূরণ হওয়া আবশ্যকঃ

(১) তাঁকে অবশ্যই সাধু পিটারের উত্তরসূরি হিসেবে তাঁর আনুষ্ঠানিক অবস্থান থেকে কথা বলতে হবে;

(২) তাঁকে অবশ্যই বিশ্বাস বা নৈতিকতা সংক্রান্ত কোনো বিষয়ে কথা বলতে হবে; এবং

(৩) তাঁকে অবশ্যই কোনো মতবাদকে আনুষ্ঠানিকভাবে এমনভাবে সংজ্ঞায়িত করতে হবে, যা সকল বিশ্বাসীর জন্য মেনে চলা বাধ্যতামূলক।

 

 

গ্যালিলিওর ক্ষেত্রে দ্বিতীয় ও তৃতীয় শর্তটি অনুপস্থিত ছিল, এমনকি প্রথম শর্তটিও পূরণ হয়নি। ক্যাথলিক চার্চের ধর্মতত্ত্বে কখনোই এমন দাবি করা হয়নি যে, কোনো ট্রাইব্যুনালের ডিক্রি বা আদেশ কেবল পোপ কর্তৃক অনুমোদিত হলেই তা ‘অব্যর্থতা’র প্রয়োগ হিসেবে গণ্য করা হবে। তাই এ কথা বলা, “ক্যাথলিক চার্চ একটি বৈজ্ঞানিক তত্ত্বকে ‘অব্যর্থ’ভাবে সংজ্ঞায়িত করেছিল, যা পরবর্তীতে ভুল প্রমাণিত হয়েছে”, এমন দাবি করাটা এক বিভ্রান্তিকর যুক্তি (Straw Man Argumen)। 


এখানে একজন মানুষ যা বলতে পারেন তা হলো, গ্যালিলিওর সময়কালে ক্যাথলিক চার্চ এমন একজন বিজ্ঞানীর বিষয়ে এক শৃঙ্খলাগত রায় দিয়েছিল, যিনি এমন একটি নতুন ও তখনও পর্যন্ত প্রমাণিত নয় এমন তত্ত্ব প্রচার করছিলেন এবং ক্যাথলিক চার্চের কাছে দাবি জানিয়েছিলেন যেন তারা তাঁর তত্ত্বের সাথে সামঞ্জস্য রেখে বাইবেলের সম্পর্কে নিজেদের ব্যাখ্যা ও দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন করে।

 

 

শেষের কথা

এটা ভালোই হয়েছে যে ক্যাথলিক চার্চ সেসময়ে গ্যালিলিওর সূর্যকেন্দ্রিক বিশ্বতত্ত্বের (Heliocentric Theory) মতবাদের দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ করতে তাড়াহুড়ো করেনি। কারণ শেষ পর্যন্ত দেখা যায় যে গ্যালিলিওর ধারণাগুলোও পুরোপুরি সঠিক ছিল না। গ্যালিলিও বিশ্বাস করতেন যে, সূর্য কেবল সৌরজগতেরই স্থির কেন্দ্র নয়, বরং পুরো মহাবিশ্বেরই স্থির কেন্দ্র। আমরা এখন জানি যে সূর্য মহাবিশ্বের কেন্দ্র নয় এবং এটি নিজেও গতিশীল। সূর্য পৃথিবীর চারদিকে নয়, বরং গ্যালাক্সির কেন্দ্রের চারদিকেও আবর্তন করছে।

 

এ কথা সত্যি যে, ক্যাথলিক চার্চের ভিতরেই অনেক ব্যাক্তি ছিলেন যারা গ্যালিলিওর মতবাদের প্রতি বেশ ইতিবাচক মনোভাব রাখতেন। কিন্তু ক্যাথলিক চার্চ যদি সেসময়ে তাড়াহুড়ো করে গ্যালিলিওর মতবাদকে সমর্থন করত, তবে ক্যাথলিক চার্চ এমন একটি বিষয়কে গ্রহণ করে নিত, যা আধুনিক বিজ্ঞানে ভুল বলে প্রমাণ হতো। ফলে ক্যাথলিক চার্চ ধর্মতাত্ত্বিক ও নৈতিক শিক্ষাপ্রদানের ব্যাপারে বিশ্বাসীদের কাছে গুরুত্বহীন হয়ে পড়তো।